পর্ব ৪ — বন্ধ দরজার ওপাশে বাড়ি ফিরে ইনায়া প্রথমেই বুঝতে পারল, কিছু একটা ঠিক নেই। ড্রয়িংরুমে সাধারণত এই সময় টেলিভিশনের শব্দ থাকে, যায়রার হাসির শব্দ থাকে, মায়ের সঙ্গে তার গল্প থাকে। কিন্তু আজ পুরো বাড়িটা অস্বাভাবিক শান্ত। ইনায়া ধীরে ধীরে মায়ের ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ। — “মা?” কোনো উত্তর নেই। — “মা, আমি এসেছি।” কিছুক্ষণ পর দরজা খুলে গেল। তাহমিনা দাঁড়িয়ে আছেন। মুখে হাসি নেই। ইনায়া অবাক হয়ে বলল, — “কী হয়েছে?” তাহমিনা কিছুক্ষণ মেয়ের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, — “তুমি আজ কোথায় গিয়েছিলে?” — “জায়রা আর কয়েকজনের সঙ্গে বাইরে।” — “কার সঙ্গে?” ইনায়া একটু থেমে বলল, — “জায়েনের সঙ্গে। আরিশও ছিল।” “আরিশ” নামটা শুনেই তাহমিনার মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেল। মাত্র এক মুহূর্তের জন্য। কিন্তু ইনায়ার চোখ সেটা এড়িয়ে গেল না। — “মা?” তাহমিনা দ্রুত নিজেকে সামলে নিলেন। — “কিছু না।” — “তুমি আরিশের নাম শুনে এমন করলে কেন?” — “আমি কাউকে চিনি না।” ইনায়া চুপ করে গেল। কথাটা অদ্ভুত লাগল। কারণ তার মা সাধারণত কখনো এমনভাবে কথা বলেন না। তাহমিনা অন্যদিকে তাকিয়ে বললেন, — “তুমি তোমার ঘরে যাও।” — “কিন্তু—” — “ইনায়া।” কণ্ঠটা এবার কঠিন। ইনায়া আর কিছু বলল না। চুপচাপ ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। রাত প্রায় সাড়ে দশটা। ইনায়া বিছানায় বসে ফোন দেখছিল। হঠাৎ তার ফোনে একটা অচেনা নম্বর থেকে মেসেজ এল। “আজ তোমার মায়ের মুখটা খেয়াল করেছিলে?” ইনায়ার বুক ধক করে উঠল। সে সঙ্গে সঙ্গে রিপ্লাই করল— “আপনি কে?” কিছুক্ষণ কোনো উত্তর এল না। তারপর— “যে সত্যিটা তোমার পরিবার তোমার কাছ থেকে লুকিয়ে রেখেছে, সেটা আমি জানি।” ইনায়া কিছুক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর লিখল— “কী সত্যি?” এবারও কোনো উত্তর নেই। শুধু কয়েক সেকেন্ড পর আরেকটা ছবি এল। ইনায়া ছবিটা খুলতেই তার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। ছবিতে তার মা। কিন্তু ছবিটা অনেক বছর আগের। তাহমিনা দাঁড়িয়ে আছেন একটা অচেনা বাড়ির সামনে। তার পাশে আরও দুজন মানুষ। একজন পুরুষ। আর একজন ছোট মেয়ে। ইনায়া ছবিটা জুম করে দেখল। ছোট মেয়েটার মুখটা স্পষ্ট নয়। কিন্তু তার গায়ে থাকা ছোট্ট লকেটটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ইনায়া নিজের গলার দিকে হাত দিল। তার গলায় থাকা লকেটটা ঠিক একই রকম। সে ফিসফিস করে বলল, — “এটা কীভাবে সম্ভব?” ঠিক তখনই দরজায় টোকা পড়ল। ইনায়া তাড়াতাড়ি ফোনটা লুকিয়ে ফেলল। — “কে?” দরজা খুলে যায়রা ঢুকল। — “এত রাতে এখনো জেগে আছিস?” ইনায়া কিছু বলল না। যায়রা তার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, — “কী হয়েছে?” — “কিছু না।” — “তুই মিথ্যা বলছিস।” ইনায়া এবার মৃদু হেসে বলল, — “ঘুমাতে যা।” যায়রা চলে যাওয়ার পর ইনায়া আবার ফোনটা হাতে নিল। কিন্তু এবার— মেসেজগুলো নেই। ছবিটাও নেই। চ্যাটটা যেন কখনো ছিলই না। ইনায়া হতভম্ব হয়ে বসে রইল। তারপর হঠাৎ ফোনের গ্যালারিতে একটা নতুন ছবি দেখতে পেল। ছবিটা আজকের। কয়েক ঘণ্টা আগে ক্যাফের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা ইনায়া ও আরিশের ছবি। কেউ তাদের ছবি তুলেছিল। কিন্তু কে? ইনায়া ধীরে ধীরে জানালার দিকে তাকাল। জানালার পর্দা নড়ছে। সে উঠে গিয়ে পর্দা সরাল। বাইরে অন্ধকার রাস্তা। কেউ নেই। শুধু রাস্তার একপাশে একটা কালো গাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল। আর গাড়ির ভেতর থেকে— কেউ একজন তাদের বাড়ির দিকে তাকিয়ে ছিল। ইনায়া চোখের পলক ফেলতেই গাড়িটা ধীরে ধীরে চলে গেল। সে জানত না— এই রাতের পর তার স্বাভাবিক জীবনটা আর আগের মতো থাকবে না। চলবে......
পর্ব ৩ — বিপদে পড়া পরিচয় — “তুই নিশ্চিত এটা ঠিক জায়গা?” জায়রা গাড়ি থেকে নেমে চারপাশে তাকিয়ে বলল, — “একশো ভাগ।” ইনায়া ভ্রু কুঁচকে তাকাল। — “তোর একশো ভাগ মানেই আমার কাছে পঞ্চাশ ভাগ বিপদ।” জায়রা হাসল। আজ তারা শহরের বাইরে একটা বড় লেকসাইড পার্কে এসেছে। জায়েন আগেই বলেছিল, এখানে একটা ছোট্ট ফুড ফেস্টিভ্যাল হচ্ছে। সবাই মিলে একটু ঘুরবে, খাবে, ছবি তুলবে—এই ছিল পরিকল্পনা। কিন্তু ইনায়া নামার পাঁচ মিনিটের মধ্যেই একটা সমস্যায় পড়ে গেল। তার হাতে থাকা আইসক্রিমটা হঠাৎ পাশ দিয়ে দৌড়ে যাওয়া একটা ছোট বাচ্চার জামায় লেগে গেল। ইনায়া থমকে গেল। বাচ্চাটা তার দিকে তাকিয়ে কাঁদো কাঁদো মুখ করতেই ইনায়া হাঁটু গেড়ে বসে বলল, — “আচ্ছা আচ্ছা, কাঁদিস না। এটা আমার ভুল।” বাচ্চাটার মা এগিয়ে এসে হেসে বললেন, — “কোনো সমস্যা নেই।” ইনায়া স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। ঠিক তখন পাশ থেকে একটা গলা— — “আপনার পাঁচ মিনিটেই এত কাণ্ড হয়ে গেল?” ইনায়া ঘুরে তাকাল। আরিশ। সে ভ্রু তুলে তাকিয়ে আছে। ইনায়া বলল, — “আপনি আবার!” — “আমি তো ভাবছিলাম আজ শান্তিতে কাটবে।” — “আমার জন্য আপনার দিন নষ্ট হচ্ছে?” — “এখনও হয়নি। তবে সম্ভাবনা আছে।” ইনায়া চোখ সরু করল। — “আপনি আমাকে খুব বেশি চিনে ফেলেছেন মনে হচ্ছে।” আরিশ হেসে বলল, — “আপনাকে বুঝতে খুব বেশি সময় লাগে না।” — “ওহ! তাই?” ইনায়া হাতে থাকা আইসক্রিমটা তুলে ধরল। — “তাহলে এটা ধরুন।” আরিশ এক পা পিছিয়ে গেল। — “না।” — “কেন?” — “আপনার হাতে থাকলে এটা নিরাপদ না।” জায়েন পাশ থেকে হেসে উঠল। — “ভাই, তুই আজ ঠিক কথা বলেছিস।” ইনায়া সঙ্গে সঙ্গে জায়েনের দিকে তাকাল। — “আপনিও ওর দলে?” — “আমি সত্যের দলে।” — “তাহলে আজ থেকে আপনি আমার শত্রু।” জায়েন নাটকীয়ভাবে বুকের ওপর হাত রাখল। — “এত দ্রুত সম্পর্ক শেষ!” যায়রা হেসে বলল, — “তোদের নিয়ে আমি আর পারছি না।” কিছুক্ষণ পর সবাই একটা গেমের স্টলে গেল। স্টলের সামনে লেখা— “এক মিনিটে তিনটা রিং ফেলুন, জিতুন বিশাল টেডি।” ইনায়ার চোখ চকচক করে উঠল। — “আমি খেলব।” আরিশ বলল, — “আপনি পারবেন?” ইনায়া তার দিকে তাকাল। — “আপনি কি আমাকে চ্যালেঞ্জ করলেন?” — “না। শুধু জিজ্ঞেস করলাম।” — “এখন চ্যালেঞ্জ হয়ে গেছে।” জায়েন হেসে বলল, — “এই তো আসল মজা!” ইনায়া তিনটা রিং হাতে নিল। প্রথমটা— মিস। দ্বিতীয়টা— মিস। তৃতীয়টা— সোজা পাশের বাক্সে গিয়ে পড়ল। সবাই চুপ। জায়েন মুখ চেপে হাসছে। আরিশ বলল, — “অসাধারণ।” ইনায়া বিরক্ত হয়ে বলল, — “হাসবেন না!” — “আমি হাসছি না।” — “আপনার মুখ হাসছে।” আরিশ এবার সত্যিই হেসে ফেলল। ইনায়া তার দিকে তাকিয়ে বলল, — “ঠিক আছে। এবার আপনি খেলুন।” — “আমি?” — “হ্যাঁ।” আরিশ তিনটা রিং নিল। প্রথমটা— সফল। দ্বিতীয়টা— সফল। তৃতীয়টাও— সফল। স্টলের লোকটা একটা বিশাল টেডি এগিয়ে দিল। জায়েন চিৎকার করে বলল, — “ওহ! প্রেমের প্রথম পুরস্কার!” — “জায়েন!” আরিশ আর ইনায়া দুজনেই একসঙ্গে চিৎকার করল। জায়েন হাসতে হাসতে পিছিয়ে গেল। — “আচ্ছা আচ্ছা, কিছু বলছি না!” আরিশ টেডিটা ইনায়ার দিকে এগিয়ে দিল। — “নিন।” ইনায়া অবাক হয়ে বলল, — “আমাকে?” — “আপনি তো খেলেছিলেন।” — “কিন্তু জিতেছেন আপনি।” — “তাই তো আপনাকে দিচ্ছি।” ইনায়া টেডিটা হাতে নিল। তার মুখে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল। — “থ্যাঙ্ক ইউ।” আরিশ শুধু মাথা নেড়ে বলল, — “ওয়েলকাম।” বিকেলের শেষে সবাই লেকের পাশে বসেছিল। হঠাৎ ইনায়ার ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে মায়ের কল। — “হ্যালো, মা?” ওপাশ থেকে তাহমিনার কণ্ঠ কিছুটা অস্থির শোনাল। — “ইনায়া, তুমি কোথায়?” — “বাইরে। কেন?” কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর তাহমিনা বললেন, — “বাড়ি ফিরে আমার সঙ্গে একটু কথা বলবে।” — “কী হয়েছে?” — “ফিরে এসো। তারপর বলব।” কল কেটে গেল। ইনায়া ফোনটা নামিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। যায়রা জিজ্ঞেস করল, — “কী হয়েছে?” ইনায়া মাথা নাড়ল। — “জানি না।” আরিশ দূর থেকে কথাটা শুনলেও কিছু বলল না। শুধু তার চোখে এক মুহূর্তের জন্য অদ্ভুত একটা চিন্তার ছাপ দেখা গেল। আর সেই মুহূর্তেই— ইনায়ার হাতে থাকা টেডিটার ভেতর থেকে একটা ছোট্ট কাগজ মাটিতে পড়ে গেল। কেউ খেয়াল করল না। শুধু আরিশের চোখে পড়ল। সে নিচু হয়ে কাগজটা তুলে নিল। কাগজে লেখা মাত্র তিনটি শব্দ— “তাকে এখনও বলো না।” আরিশ ধীরে ধীরে কাগজটা ভাঁজ করল। ইনায়ার দিকে তাকাল। তারপর কাগজটা নিজের পকেটে রেখে দিল। কেন—সেটা সে নিজেও জানত না। চলবে...........
পর্ব ২ — প্রথম পরিচয় সকালের রোদটা জানালার কাঁচে এসে পড়তেই ইনায়ার ঘুম ভাঙল। ঘুম থেকে উঠেই তার প্রথম কাজ হলো ফোনটা হাতে নেওয়া। কয়েকটা নোটিফিকেশন দেখার পর ফোনটা পাশে রেখে সে আয়নার সামনে দাঁড়াল। আজ তাকে একটু অন্যরকম লাগছিল। চুলগুলো খোলা রেখেই নিচে নামতে গিয়ে সিঁড়ির মাঝখানে যায়রার সঙ্গে ধাক্কা খেল। — “এই! দেখে হাঁটতে পারিস না?” ইনায়া হেসে বলল, — “তুই মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিলি।” — “আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম, নাকি তুই স্বপ্ন দেখতে দেখতে হাঁটছিলি?” — “দুটোই হতে পারে।” যায়রা মাথা নাড়ল। — “তোর সঙ্গে তর্ক করে লাভ নেই।” নিচে এসে দুজন নাশতার টেবিলে বসল। তাহমিনা বললেন, — “আজ তোমরা বাইরে যাবে?” যায়রা বলল, — “হ্যাঁ। আমার একজন বন্ধুর সঙ্গে দেখা করার কথা।” ইনায়া অবাক হয়ে বলল, — “কোন বন্ধু?” — “জায়েন।” — “জায়েন কে?” — “তুই দেখলেই চিনবি।” ইনায়া আর কিছু বলল না। দুপুরের দিকে তারা শহরের একটা শান্ত ক্যাফেতে গেল। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর একজন ছেলে এসে তাদের সামনে দাঁড়াল। — “সরি, একটু দেরি হয়ে গেল।” যায়রা হাসল। — “জায়েন, এ হলো আমার বোন ইনায়া।” জায়েন ইনায়ার দিকে তাকিয়ে হাসল। — “হাই।”
— “হাই।” ইনায়া খুব স্বাভাবিকভাবেই উত্তর দিল। জায়েন বসতে বসতে বলল,
— “আপনার কথা অনেক শুনেছি।” ইনায়া সঙ্গে সঙ্গে যায়রার দিকে তাকাল।
— “কী বলেছিস আমার নামে?” যায়রা হেসে বলল,
— “সত্যি কথাই বলেছি।”
— “কোন সত্যি?”
জায়েন হেসে বলল,
— “সেটা আমি এখনই বলছি না।”
ইনায়া চোখ ছোট করে তাকাল।
— “আপনাকে সন্দেহজনক মনে হচ্ছে।”
— “প্রথম দেখাতেই?”
— “হুম।”
জায়েন হেসে মাথা নাড়ল।
— “তাহলে পরিচয়টা ভালোভাবেই শুরু হলো।”
তিনজনের কথাবার্তার মাঝেই হঠাৎ জায়েনের ফোন বেজে উঠল। সে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বলল,
— “এই তো, আরিশের কল।”
কলটা কেটে দিয়ে সে বলল,
— “ও কাছেই আছে। একটু পর আসবে।”
ইনায়া কিছু না বলে চায়ের কাপটা হাতে নিল। কেন জানি না, নামটা শুনেই তার মনে হলো— আরিশ নামটা সে যেন কোথাও আগে শুনেছে। কিন্তু কোথায়, সেটা মনে পড়ল না। কয়েক মিনিট পর ক্যাফের দরজা খুলে একজন ছেলে ভেতরে ঢুকল। জায়েন হাত তুলে ডাকল।
— “আরিশ! এইদিকে।”
আরিশ এগিয়ে এসে টেবিলের পাশে দাঁড়াল। জায়েন পরিচয় করিয়ে দিল,
— “এ হলো আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু আরিশ।” তারপর ইনায়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
— “আর এ হলো ইনায়া।”
আরিশের চোখ এক মুহূর্তের জন্য ইনায়ার দিকে থেমে গেল।
— “আপনি ইনায়া?”
ইনায়া একটু অবাক হয়ে বলল,
— “হ্যাঁ। আপনি আমাকে চেনেন?” আরিশ মৃদু হাসল।
— “না। তবে নামটা শুনেছি।”
ইনায়া বলল, — “আজকাল মনে হচ্ছে সবাই আমার নাম জানে।” জায়েন হেসে বলল,
সবাই হেসে উঠল। সেদিনের বিকেলটা খুব সাধারণভাবেই কেটে গেল। কোনো বড় ঘটনা ঘটল না। কোনো রহস্যের দরজা খুলল না। শুধু চারজন অচেনা মানুষ ধীরে ধীরে পরিচিত হলো। আর ইনায়া তখনও জানত না— আজকের এই সাধারণ পরিচয়গুলোই একদিন তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্কগুলোর অংশ হয়ে উঠবে। আরিশও জানত না, এই মেয়েটার সঙ্গে তার পরিচয়টা এত সহজে শেষ হওয়ার নয়। চলবে.......
🌙 মায়ার শেষ প্রহর পর্ব — ০১ : অচেনা দরজার ওপারে রাত তখন প্রায় সাড়ে এগারোটা। শহরের ব্যস্ততা অনেক আগেই থেমে গেছে। জানালার কাঁচে টুপটাপ বৃষ্টির শব্দ, দূরে কোথাও গাড়ির হর্ন, আর মাঝেমধ্যে বাতাসে গাছের পাতার অদ্ভুত শব্দ—সব মিলিয়ে রাতটা কেমন যেন অস্বাভাবিক শান্ত। ইনায়া জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। হাতে ধরা ফোনের স্ক্রিনটা বারবার জ্বলে উঠছিল, আবার নিভে যাচ্ছিল। একটা মেসেজ। মাত্র একটা। কিন্তু সেই একটা মেসেজই গত এক ঘণ্টা ধরে তার মাথার ভেতর হাজারটা প্রশ্ন তৈরি করেছে। “তুমি কি সত্যিই ভেবেছ, অতীত থেকে পালিয়ে বাঁচতে পারবে?” ইনায়া মেসেজটার দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে রইল। তার আঙুল ধীরে ধীরে কেঁপে উঠল। —“আবার শুরু হলো…” পেছন থেকে দরজা খোলার শব্দ হতেই সে দ্রুত ফোনটা উল্টে রাখল। —“ইনায়া?” জায়রার কণ্ঠ। ইনায়া ঘুরে তাকাল। জায়রা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে, হাতে এক কাপ চা। মুখে বিরক্তির ছাপ। —“তুমি এখনো ঘুমাওনি?” ইনায়া জোর করে হাসল। —“ঘুম আসছে না।” জায়রা ভেতরে এসে বিছানায় বসে বলল, —“ঘুম আসছে না, নাকি আবার ওই রহস্যময় ফোন আর মেসেজ নিয়ে বসে আছ?” ইনায়া কিছু বলল না। জায়রা চোখ ছোট করে তাকাল। —“তুমি কিছু লুকাচ্ছ।” —“কী লুকাব?” —“সেটাই তো জানতে চাইছি।” কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। ইনায়া জানালার বাইরে তাকাল। —“সবকিছু সবাইকে বলা যায় না, জাইরা।” জায়রা এবার চুপ হয়ে গেল। বোনের মুখের দিকে তাকিয়ে তার হাসিটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। —“তাহলে অন্তত আমাকে বলো। আমি তো সবাই না।” ইনায়া এবার বোনের দিকে তাকাল। চোখে এক মুহূর্তের জন্য ভয় ফুটে উঠেছিল। কিন্তু পরক্ষণেই সেটা লুকিয়ে ফেলল। —“সময় হলে সব বলব।” জায়রা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। —“তুমি সবসময় এই একটা কথাই বলো।” তারপর উঠে দরজার দিকে যেতে যেতে বলল, —“যাই হোক, কাল কিন্তু আমার সঙ্গে বের হতে হবে।” ইনায়া অবাক হলো। —“কোথায়?” জায়রা রহস্যময়ভাবে হাসল। —“কাল তোমাকে একজনের সঙ্গে দেখা করাব।” —“কে?” —“কাল জানবে।” —“জাইরা!” জায়রা হেসে দরজা বন্ধ করে দিল। ইনায়া কিছুক্ষণ দরজার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর আবার ফোনটা হাতে নিল। মেসেজটা এখনো সেখানে। কিন্তু এবার মেসেজের নিচে আরও একটি নতুন লাইন এসেছে। “আগামীকাল থেকে তোমার জীবন আর আগের মতো থাকবে না।” ইনায়ার মুখের হাসি পুরোপুরি মিলিয়ে গেল। পরদিন সকালটা অদ্ভুতভাবে স্বাভাবিক ছিল। পাখির ডাক, রোদের নরম আলো, রান্নাঘর থেকে খাবারের গন্ধ—সবকিছুই যেন আগের মতো। শুধু ইনায়ার ভেতরটা স্বাভাবিক ছিল না। জায়রা প্রায় জোর করেই তাকে বাইরে নিয়ে বের হলো। —“তুমি এত চুপচাপ কেন?” —“এমনিই।” —“তুমি যখন ‘এমনিই’ বলো, তখনই বুঝি কিছু একটা হয়েছে।” ইনায়া হালকা হেসে বলল, —“তুমি বেশি ভাবো।” জায়রা উত্তর দিল না। কিছুক্ষণ পর গাড়ি একটা বড় ক্যাফের সামনে থামল। ইনায়া চারপাশে তাকাল। —“এখানে কেন?” জায়রা গাড়ি থেকে নেমে বলল, —“বলেছি না, একজনের সঙ্গে দেখা করাব?” —“কে?” জায়রা শুধু বলল, —“চলো।” দুজন ভেতরে ঢুকল। ক্যাফের এক কোণের টেবিলে একজন ছেলে বসে ছিল। কালো শার্ট, ঘড়ি, সামনে রাখা কফির কাপ। তার মুখে অদ্ভুত শান্ত একটা ভাব। জায়রা তাকে দেখেই হাত নাড়ল। —“আরিশ!” ছেলেটা মাথা তুলে তাকাল। তার চোখ প্রথমে জায়রার দিকে গেল। তারপর ইনায়ার দিকে। এক মুহূর্তের জন্য তার দৃষ্টি থেমে গেল। ইনায়াও ছেলেটার দিকে তাকিয়ে রইল। জায়রা হাসতে হাসতে বলল, —“ইনায়া, ও আরিশ। আরিশ, এ আমার বোন ইনায়া।” আরিশ উঠে দাঁড়াল। —“হাই।” ইনায়া সামান্য মাথা নেড়ে বলল, —“হাই।” জায়রা দুজনের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল। —“ঠিক আছে, তোমরা বসো। আমি খাবারের অর্ডার দিচ্ছি।” ইনায়া সঙ্গে সঙ্গে বলল, —“জাইরা, তুমি কোথায় যাচ্ছ?” —“খাবার আনতে।” —“আমিও যাব।” —“না।” —“কেন?” জায়রা হাসল। —“তোমাদের পরিচয়টা একটু শান্তিতে হতে দাও।” বলেই সে চলে গেল। ইনায়া বিরক্ত মুখে তার চলে যাওয়া দেখল। আরিশ মৃদু হেসে বলল, —“তোমার বোন সবসময় এমন?” ইনায়া তাকাল। —“দুর্ভাগ্যবশত।” আরিশ হেসে ফেলল। ইনায়ার মুখেও অল্প হাসি ফুটে উঠল। প্রথমবারের মতো সকাল থেকে তার মুখে সত্যিকারের হাসি দেখা গেল। কিন্তু সেই মুহূর্তেই— তার ফোনটা বেজে উঠল। ইনায়া স্ক্রিনের দিকে তাকাল। একটা অচেনা নম্বর। কল কেটে দিল সে। দুই সেকেন্ড পর আবার কল। আরিশ লক্ষ্য করল। —“ধরবে না?” ইনায়া শান্ত গলায় বলল, —“না।” আবার কল। এবার ইনায়ার চোখে বিরক্তির বদলে অস্বস্তি দেখা দিল। সে ফোনটা সাইলেন্ট করে ব্যাগে রেখে দিল। আরিশ কিছু বলল না। কিন্তু তার চোখে প্রশ্ন ছিল। ঠিক তখনই ক্যাফের দরজা দিয়ে আরেকজন ঢুকল। জায়েন। আরিশের সবচেয়ে কাছের বন্ধু। ভেতরে ঢুকেই সে চারপাশে তাকাল। তারপর আরিশকে দেখতে পেয়ে এগিয়ে এলো। —“ভাই, তুই এখানে বসে আছিস আর আমাকে বলিসনি?” আরিশ বিরক্ত হয়ে বলল, —“তুই নিজেই তো বলেছিলি আজ আসবি না।” জায়েন চেয়ার টেনে বসে বলল, —“প্ল্যান বদলেছে।” তার চোখ এবার ইনায়ার দিকে গেল। জায়েন ভদ্রভাবে হাসল। —“হাই। আমি জায়েন।” ইনায়া মাথা নেড়ে বলল, —“ইনায়া।” জায়েন কিছু বলতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই— ইনায়ার ফোনে একটা নোটিফিকেশন এলো। সে অনিচ্ছা সত্ত্বেও স্ক্রিনের দিকে তাকাল। একটা ছবি এসেছে। ইনায়ার চোখ বড় হয়ে গেল। ছবিটা তার পুরোনো বাড়ির। সেই বাড়ি… যেটার কথা সে বহু বছর ধরে কাউকে বলেনি। ছবির নিচে মাত্র একটা বাক্য— “তুমি যত দূরেই যাও, কিছু দরজা তোমার জন্য সবসময় খোলা থাকে।” ইনায়ার হাত ঠান্ডা হয়ে গেল। সে দ্রুত ফোনটা বন্ধ করে ফেলল। কিন্তু এবার আরিশ বিষয়টা লক্ষ্য করেছে। —“সব ঠিক আছে?” ইনায়া তার দিকে তাকাল। কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বলল, —“হ্যাঁ।” জায়েনও এবার ইনায়ার মুখের দিকে তাকাল। কিন্তু কেউ আর কিছু জিজ্ঞেস করল না। সন্ধ্যার দিকে বাড়ি ফেরার পর ইনায়া নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করল। আলমারি খুলে একেবারে নিচের ড্রয়ারটা বের করল। ভেতরে একটা পুরোনো কাঠের বাক্স। বাক্সটা খুলতেই দেখা গেল— একটা পুরোনো ছবি। একটা চাবি। আর একটা ছোট কাগজ। ইনায়া ছবিটা হাতে নিল। ছবিতে ছিল চারজন মানুষ। কিন্তু ছবিটার সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়— ছবির এক কোণে ছোট্ট ইনায়া দাঁড়িয়ে ছিল। সে ছবিটা উল্টে পেছনের লেখা পড়ল। “যেদিন মায়ার শেষ প্রহর শুরু হবে, সেদিন সত্যি আর লুকিয়ে থাকবে না।” ইনায়া চোখ বন্ধ করল। তারপর ধীরে ধীরে ফিসফিস করে বলল— —“তাহলে… সময় এসে গেছে?” ঠিক তখনই— দরজার বাইরে কারও পায়ের শব্দ। ইনায়া দ্রুত ছবিটা লুকিয়ে ফেলল। —“কে?” কোনো উত্তর নেই। সে দরজা খুলল। করিডোর ফাঁকা। কিন্তু মেঝেতে পড়ে আছে একটা কালো খাম। ইনায়া খামটা তুলে নিল। খামের ওপর তার নাম লেখা— ইনায়া। সে ধীরে ধীরে খামটা খুলল। ভেতরে মাত্র এক লাইন— “তোমার গল্পটা তুমি যেখান থেকে শুরু হয়েছে ভাবছ, আসলে সেখান থেকে শুরু হয়নি।” ইনায়ার চোখ স্থির হয়ে গেল। আর সেই মুহূর্তে— বাড়ির নিচতলায় একটা গাড়ি এসে থামল। গাড়ি থেকে একজন নামল। তার হাতে ছিল একই রকম একটি কালো খাম। আর সেই মানুষটি ছিল— আরিশ। চলবে…
♡𐙚 𝐋𝐮𝐜𝐚’𝐬 𝐂𝐡𝐞𝐫𝐫𝐲! 𐙚♡
মায়ার শেষ প্রহর
পর্ব ৪ — বন্ধ দরজার ওপাশে
বাড়ি ফিরে ইনায়া প্রথমেই বুঝতে পারল, কিছু একটা ঠিক নেই।
ড্রয়িংরুমে সাধারণত এই সময় টেলিভিশনের শব্দ থাকে, যায়রার হাসির শব্দ থাকে, মায়ের সঙ্গে তার গল্প থাকে।
কিন্তু আজ পুরো বাড়িটা অস্বাভাবিক শান্ত।
ইনায়া ধীরে ধীরে মায়ের ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ।
— “মা?”
কোনো উত্তর নেই।
— “মা, আমি এসেছি।”
কিছুক্ষণ পর দরজা খুলে গেল।
তাহমিনা দাঁড়িয়ে আছেন।
মুখে হাসি নেই।
ইনায়া অবাক হয়ে বলল,
— “কী হয়েছে?”
তাহমিনা কিছুক্ষণ মেয়ের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন,
— “তুমি আজ কোথায় গিয়েছিলে?”
— “জায়রা আর কয়েকজনের সঙ্গে বাইরে।”
— “কার সঙ্গে?”
ইনায়া একটু থেমে বলল,
— “জায়েনের সঙ্গে। আরিশও ছিল।”
“আরিশ” নামটা শুনেই তাহমিনার মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেল।
মাত্র এক মুহূর্তের জন্য।
কিন্তু ইনায়ার চোখ সেটা এড়িয়ে গেল না।
— “মা?”
তাহমিনা দ্রুত নিজেকে সামলে নিলেন।
— “কিছু না।”
— “তুমি আরিশের নাম শুনে এমন করলে কেন?”
— “আমি কাউকে চিনি না।”
ইনায়া চুপ করে গেল।
কথাটা অদ্ভুত লাগল।
কারণ তার মা সাধারণত কখনো এমনভাবে কথা বলেন না।
তাহমিনা অন্যদিকে তাকিয়ে বললেন,
— “তুমি তোমার ঘরে যাও।”
— “কিন্তু—”
— “ইনায়া।”
কণ্ঠটা এবার কঠিন।
ইনায়া আর কিছু বলল না।
চুপচাপ ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
রাত প্রায় সাড়ে দশটা।
ইনায়া বিছানায় বসে ফোন দেখছিল।
হঠাৎ তার ফোনে একটা অচেনা নম্বর থেকে মেসেজ এল।
“আজ তোমার মায়ের মুখটা খেয়াল করেছিলে?”
ইনায়ার বুক ধক করে উঠল।
সে সঙ্গে সঙ্গে রিপ্লাই করল—
“আপনি কে?”
কিছুক্ষণ কোনো উত্তর এল না।
তারপর—
“যে সত্যিটা তোমার পরিবার তোমার কাছ থেকে লুকিয়ে রেখেছে, সেটা আমি জানি।”
ইনায়া কিছুক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর লিখল—
“কী সত্যি?”
এবারও কোনো উত্তর নেই।
শুধু কয়েক সেকেন্ড পর আরেকটা ছবি এল।
ইনায়া ছবিটা খুলতেই তার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
ছবিতে তার মা।
কিন্তু ছবিটা অনেক বছর আগের।
তাহমিনা দাঁড়িয়ে আছেন একটা অচেনা বাড়ির সামনে।
তার পাশে আরও দুজন মানুষ।
একজন পুরুষ।
আর একজন ছোট মেয়ে।
ইনায়া ছবিটা জুম করে দেখল।
ছোট মেয়েটার মুখটা স্পষ্ট নয়।
কিন্তু তার গায়ে থাকা ছোট্ট লকেটটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
ইনায়া নিজের গলার দিকে হাত দিল।
তার গলায় থাকা লকেটটা ঠিক একই রকম।
সে ফিসফিস করে বলল,
— “এটা কীভাবে সম্ভব?”
ঠিক তখনই দরজায় টোকা পড়ল।
ইনায়া তাড়াতাড়ি ফোনটা লুকিয়ে ফেলল।
— “কে?”
দরজা খুলে যায়রা ঢুকল।
— “এত রাতে এখনো জেগে আছিস?”
ইনায়া কিছু বলল না।
যায়রা তার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
— “কী হয়েছে?”
— “কিছু না।”
— “তুই মিথ্যা বলছিস।”
ইনায়া এবার মৃদু হেসে বলল,
— “ঘুমাতে যা।”
যায়রা চলে যাওয়ার পর ইনায়া আবার ফোনটা হাতে নিল।
কিন্তু এবার—
মেসেজগুলো নেই।
ছবিটাও নেই।
চ্যাটটা যেন কখনো ছিলই না।
ইনায়া হতভম্ব হয়ে বসে রইল।
তারপর হঠাৎ ফোনের গ্যালারিতে একটা নতুন ছবি দেখতে পেল।
ছবিটা আজকের।
কয়েক ঘণ্টা আগে ক্যাফের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা ইনায়া ও আরিশের ছবি।
কেউ তাদের ছবি তুলেছিল।
কিন্তু কে?
ইনায়া ধীরে ধীরে জানালার দিকে তাকাল।
জানালার পর্দা নড়ছে।
সে উঠে গিয়ে পর্দা সরাল।
বাইরে অন্ধকার রাস্তা।
কেউ নেই।
শুধু রাস্তার একপাশে একটা কালো গাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল।
আর গাড়ির ভেতর থেকে—
কেউ একজন তাদের বাড়ির দিকে তাকিয়ে ছিল।
ইনায়া চোখের পলক ফেলতেই গাড়িটা ধীরে ধীরে চলে গেল।
সে জানত না—
এই রাতের পর তার স্বাভাবিক জীবনটা আর আগের মতো থাকবে না।
চলবে......
3 days ago | [YT] | 1
View 0 replies
♡𐙚 𝐋𝐮𝐜𝐚’𝐬 𝐂𝐡𝐞𝐫𝐫𝐲! 𐙚♡
মায়ার শেষ প্রহর
পর্ব ৩ — বিপদে পড়া পরিচয়
— “তুই নিশ্চিত এটা ঠিক জায়গা?”
জায়রা গাড়ি থেকে নেমে চারপাশে তাকিয়ে বলল,
— “একশো ভাগ।”
ইনায়া ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
— “তোর একশো ভাগ মানেই আমার কাছে পঞ্চাশ ভাগ বিপদ।”
জায়রা হাসল।
আজ তারা শহরের বাইরে একটা বড় লেকসাইড পার্কে এসেছে। জায়েন আগেই বলেছিল, এখানে একটা ছোট্ট ফুড ফেস্টিভ্যাল হচ্ছে। সবাই মিলে একটু ঘুরবে, খাবে, ছবি তুলবে—এই ছিল পরিকল্পনা।
কিন্তু ইনায়া নামার পাঁচ মিনিটের মধ্যেই একটা সমস্যায় পড়ে গেল।
তার হাতে থাকা আইসক্রিমটা হঠাৎ পাশ দিয়ে দৌড়ে যাওয়া একটা ছোট বাচ্চার জামায় লেগে গেল।
ইনায়া থমকে গেল।
বাচ্চাটা তার দিকে তাকিয়ে কাঁদো কাঁদো মুখ করতেই ইনায়া হাঁটু গেড়ে বসে বলল,
— “আচ্ছা আচ্ছা, কাঁদিস না। এটা আমার ভুল।”
বাচ্চাটার মা এগিয়ে এসে হেসে বললেন,
— “কোনো সমস্যা নেই।”
ইনায়া স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
ঠিক তখন পাশ থেকে একটা গলা—
— “আপনার পাঁচ মিনিটেই এত কাণ্ড হয়ে গেল?”
ইনায়া ঘুরে তাকাল।
আরিশ।
সে ভ্রু তুলে তাকিয়ে আছে।
ইনায়া বলল,
— “আপনি আবার!”
— “আমি তো ভাবছিলাম আজ শান্তিতে কাটবে।”
— “আমার জন্য আপনার দিন নষ্ট হচ্ছে?”
— “এখনও হয়নি। তবে সম্ভাবনা আছে।”
ইনায়া চোখ সরু করল।
— “আপনি আমাকে খুব বেশি চিনে ফেলেছেন মনে হচ্ছে।”
আরিশ হেসে বলল,
— “আপনাকে বুঝতে খুব বেশি সময় লাগে না।”
— “ওহ! তাই?”
ইনায়া হাতে থাকা আইসক্রিমটা তুলে ধরল।
— “তাহলে এটা ধরুন।”
আরিশ এক পা পিছিয়ে গেল।
— “না।”
— “কেন?”
— “আপনার হাতে থাকলে এটা নিরাপদ না।”
জায়েন পাশ থেকে হেসে উঠল।
— “ভাই, তুই আজ ঠিক কথা বলেছিস।”
ইনায়া সঙ্গে সঙ্গে জায়েনের দিকে তাকাল।
— “আপনিও ওর দলে?”
— “আমি সত্যের দলে।”
— “তাহলে আজ থেকে আপনি আমার শত্রু।”
জায়েন নাটকীয়ভাবে বুকের ওপর হাত রাখল।
— “এত দ্রুত সম্পর্ক শেষ!”
যায়রা হেসে বলল,
— “তোদের নিয়ে আমি আর পারছি না।”
কিছুক্ষণ পর সবাই একটা গেমের স্টলে গেল।
স্টলের সামনে লেখা—
“এক মিনিটে তিনটা রিং ফেলুন, জিতুন বিশাল টেডি।”
ইনায়ার চোখ চকচক করে উঠল।
— “আমি খেলব।”
আরিশ বলল,
— “আপনি পারবেন?”
ইনায়া তার দিকে তাকাল।
— “আপনি কি আমাকে চ্যালেঞ্জ করলেন?”
— “না। শুধু জিজ্ঞেস করলাম।”
— “এখন চ্যালেঞ্জ হয়ে গেছে।”
জায়েন হেসে বলল,
— “এই তো আসল মজা!”
ইনায়া তিনটা রিং হাতে নিল।
প্রথমটা—
মিস।
দ্বিতীয়টা—
মিস।
তৃতীয়টা—
সোজা পাশের বাক্সে গিয়ে পড়ল।
সবাই চুপ।
জায়েন মুখ চেপে হাসছে।
আরিশ বলল,
— “অসাধারণ।”
ইনায়া বিরক্ত হয়ে বলল,
— “হাসবেন না!”
— “আমি হাসছি না।”
— “আপনার মুখ হাসছে।”
আরিশ এবার সত্যিই হেসে ফেলল।
ইনায়া তার দিকে তাকিয়ে বলল,
— “ঠিক আছে। এবার আপনি খেলুন।”
— “আমি?”
— “হ্যাঁ।”
আরিশ তিনটা রিং নিল।
প্রথমটা—
সফল।
দ্বিতীয়টা—
সফল।
তৃতীয়টাও—
সফল।
স্টলের লোকটা একটা বিশাল টেডি এগিয়ে দিল।
জায়েন চিৎকার করে বলল,
— “ওহ! প্রেমের প্রথম পুরস্কার!”
— “জায়েন!”
আরিশ আর ইনায়া দুজনেই একসঙ্গে চিৎকার করল।
জায়েন হাসতে হাসতে পিছিয়ে গেল।
— “আচ্ছা আচ্ছা, কিছু বলছি না!”
আরিশ টেডিটা ইনায়ার দিকে এগিয়ে দিল।
— “নিন।”
ইনায়া অবাক হয়ে বলল,
— “আমাকে?”
— “আপনি তো খেলেছিলেন।”
— “কিন্তু জিতেছেন আপনি।”
— “তাই তো আপনাকে দিচ্ছি।”
ইনায়া টেডিটা হাতে নিল।
তার মুখে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল।
— “থ্যাঙ্ক ইউ।”
আরিশ শুধু মাথা নেড়ে বলল,
— “ওয়েলকাম।”
বিকেলের শেষে সবাই লেকের পাশে বসেছিল।
হঠাৎ ইনায়ার ফোনটা বেজে উঠল।
স্ক্রিনে মায়ের কল।
— “হ্যালো, মা?”
ওপাশ থেকে তাহমিনার কণ্ঠ কিছুটা অস্থির শোনাল।
— “ইনায়া, তুমি কোথায়?”
— “বাইরে। কেন?”
কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর তাহমিনা বললেন,
— “বাড়ি ফিরে আমার সঙ্গে একটু কথা বলবে।”
— “কী হয়েছে?”
— “ফিরে এসো। তারপর বলব।”
কল কেটে গেল।
ইনায়া ফোনটা নামিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
যায়রা জিজ্ঞেস করল,
— “কী হয়েছে?”
ইনায়া মাথা নাড়ল।
— “জানি না।”
আরিশ দূর থেকে কথাটা শুনলেও কিছু বলল না।
শুধু তার চোখে এক মুহূর্তের জন্য অদ্ভুত একটা চিন্তার ছাপ দেখা গেল।
আর সেই মুহূর্তেই—
ইনায়ার হাতে থাকা টেডিটার ভেতর থেকে একটা ছোট্ট কাগজ মাটিতে পড়ে গেল।
কেউ খেয়াল করল না।
শুধু আরিশের চোখে পড়ল।
সে নিচু হয়ে কাগজটা তুলে নিল।
কাগজে লেখা মাত্র তিনটি শব্দ—
“তাকে এখনও বলো না।”
আরিশ ধীরে ধীরে কাগজটা ভাঁজ করল।
ইনায়ার দিকে তাকাল।
তারপর কাগজটা নিজের পকেটে রেখে দিল।
কেন—সেটা সে নিজেও জানত না।
চলবে...........
3 days ago | [YT] | 1
View 0 replies
♡𐙚 𝐋𝐮𝐜𝐚’𝐬 𝐂𝐡𝐞𝐫𝐫𝐲! 𐙚♡
মায়ার শেষ প্রহর
পর্ব ২ — প্রথম পরিচয়
সকালের রোদটা জানালার কাঁচে এসে পড়তেই ইনায়ার ঘুম ভাঙল।
ঘুম থেকে উঠেই তার প্রথম কাজ হলো ফোনটা হাতে নেওয়া। কয়েকটা নোটিফিকেশন দেখার পর ফোনটা পাশে রেখে সে আয়নার সামনে দাঁড়াল।
আজ তাকে একটু অন্যরকম লাগছিল।
চুলগুলো খোলা রেখেই নিচে নামতে গিয়ে সিঁড়ির মাঝখানে যায়রার সঙ্গে ধাক্কা খেল।
— “এই! দেখে হাঁটতে পারিস না?”
ইনায়া হেসে বলল,
— “তুই মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিলি।”
— “আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম, নাকি তুই স্বপ্ন দেখতে দেখতে হাঁটছিলি?”
— “দুটোই হতে পারে।”
যায়রা মাথা নাড়ল।
— “তোর সঙ্গে তর্ক করে লাভ নেই।”
নিচে এসে দুজন নাশতার টেবিলে বসল।
তাহমিনা বললেন,
— “আজ তোমরা বাইরে যাবে?”
যায়রা বলল,
— “হ্যাঁ। আমার একজন বন্ধুর সঙ্গে দেখা করার কথা।”
ইনায়া অবাক হয়ে বলল,
— “কোন বন্ধু?”
— “জায়েন।”
— “জায়েন কে?”
— “তুই দেখলেই চিনবি।”
ইনায়া আর কিছু বলল না।
দুপুরের দিকে তারা শহরের একটা শান্ত ক্যাফেতে গেল।
কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর একজন ছেলে এসে তাদের সামনে দাঁড়াল।
— “সরি, একটু দেরি হয়ে গেল।”
যায়রা হাসল।
— “জায়েন, এ হলো আমার বোন ইনায়া।”
জায়েন ইনায়ার দিকে তাকিয়ে হাসল।
— “হাই।”
— “হাই।”
ইনায়া খুব স্বাভাবিকভাবেই উত্তর দিল।
জায়েন বসতে বসতে বলল,
— “আপনার কথা অনেক শুনেছি।”
ইনায়া সঙ্গে সঙ্গে যায়রার দিকে তাকাল।
— “কী বলেছিস আমার নামে?”
যায়রা হেসে বলল,
— “সত্যি কথাই বলেছি।”
— “কোন সত্যি?”
জায়েন হেসে বলল,
— “সেটা আমি এখনই বলছি না।”
ইনায়া চোখ ছোট করে তাকাল।
— “আপনাকে সন্দেহজনক মনে হচ্ছে।”
— “প্রথম দেখাতেই?”
— “হুম।”
জায়েন হেসে মাথা নাড়ল।
— “তাহলে পরিচয়টা ভালোভাবেই শুরু হলো।”
তিনজনের কথাবার্তার মাঝেই হঠাৎ জায়েনের ফোন বেজে উঠল।
সে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বলল,
— “এই তো, আরিশের কল।”
কলটা কেটে দিয়ে সে বলল,
— “ও কাছেই আছে। একটু পর আসবে।”
ইনায়া কিছু না বলে চায়ের কাপটা হাতে নিল।
কেন জানি না, নামটা শুনেই তার মনে হলো—
আরিশ নামটা সে যেন কোথাও আগে শুনেছে।
কিন্তু কোথায়, সেটা মনে পড়ল না।
কয়েক মিনিট পর ক্যাফের দরজা খুলে একজন ছেলে ভেতরে ঢুকল।
জায়েন হাত তুলে ডাকল।
— “আরিশ! এইদিকে।”
আরিশ এগিয়ে এসে টেবিলের পাশে দাঁড়াল।
জায়েন পরিচয় করিয়ে দিল,
— “এ হলো আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু আরিশ।”
তারপর ইনায়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
— “আর এ হলো ইনায়া।”
আরিশের চোখ এক মুহূর্তের জন্য ইনায়ার দিকে থেমে গেল।
— “আপনি ইনায়া?”
ইনায়া একটু অবাক হয়ে বলল,
— “হ্যাঁ। আপনি আমাকে চেনেন?”
আরিশ মৃদু হাসল।
— “না। তবে নামটা শুনেছি।”
ইনায়া বলল,
— “আজকাল মনে হচ্ছে সবাই আমার নাম জানে।”
জায়েন হেসে বলল,
— “এটা কিন্তু আপনার জনপ্রিয়তার লক্ষণ।
— “নাকি আমার দুর্ভাগ্যের?”
আরিশ এবার হেসে ফেলল।
ইনায়া তার দিকে তাকিয়ে বলল,
— “আপনি হাসতেও পারেন?”
জায়েন সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— “এই মানুষটার হাসি দেখার জন্যই তো আমাদের এত কষ্ট!”
আরিশ বিরক্ত হয়ে বলল,
— “চুপ কর।”
সবাই হেসে উঠল।
সেদিনের বিকেলটা খুব সাধারণভাবেই কেটে গেল।
কোনো বড় ঘটনা ঘটল না।
কোনো রহস্যের দরজা খুলল না।
শুধু চারজন অচেনা মানুষ ধীরে ধীরে পরিচিত হলো।
আর ইনায়া তখনও জানত না—
আজকের এই সাধারণ পরিচয়গুলোই একদিন তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্কগুলোর অংশ হয়ে উঠবে।
আরিশও জানত না,
এই মেয়েটার সঙ্গে তার পরিচয়টা এত সহজে শেষ হওয়ার নয়।
চলবে.......
3 days ago | [YT] | 1
View 0 replies
♡𐙚 𝐋𝐮𝐜𝐚’𝐬 𝐂𝐡𝐞𝐫𝐫𝐲! 𐙚♡
🌙 মায়ার শেষ প্রহর
পর্ব — ০১ : অচেনা দরজার ওপারে
রাত তখন প্রায় সাড়ে এগারোটা।
শহরের ব্যস্ততা অনেক আগেই থেমে গেছে। জানালার কাঁচে টুপটাপ বৃষ্টির শব্দ, দূরে কোথাও গাড়ির হর্ন, আর মাঝেমধ্যে বাতাসে গাছের পাতার অদ্ভুত শব্দ—সব মিলিয়ে রাতটা কেমন যেন অস্বাভাবিক শান্ত।
ইনায়া জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।
হাতে ধরা ফোনের স্ক্রিনটা বারবার জ্বলে উঠছিল, আবার নিভে যাচ্ছিল।
একটা মেসেজ।
মাত্র একটা।
কিন্তু সেই একটা মেসেজই গত এক ঘণ্টা ধরে তার মাথার ভেতর হাজারটা প্রশ্ন তৈরি করেছে।
“তুমি কি সত্যিই ভেবেছ, অতীত থেকে পালিয়ে বাঁচতে পারবে?”
ইনায়া মেসেজটার দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে রইল।
তার আঙুল ধীরে ধীরে কেঁপে উঠল।
—“আবার শুরু হলো…”
পেছন থেকে দরজা খোলার শব্দ হতেই সে দ্রুত ফোনটা উল্টে রাখল।
—“ইনায়া?”
জায়রার কণ্ঠ।
ইনায়া ঘুরে তাকাল।
জায়রা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে, হাতে এক কাপ চা। মুখে বিরক্তির ছাপ।
—“তুমি এখনো ঘুমাওনি?”
ইনায়া জোর করে হাসল।
—“ঘুম আসছে না।”
জায়রা ভেতরে এসে বিছানায় বসে বলল,
—“ঘুম আসছে না, নাকি আবার ওই রহস্যময় ফোন আর মেসেজ নিয়ে বসে আছ?”
ইনায়া কিছু বলল না।
জায়রা চোখ ছোট করে তাকাল।
—“তুমি কিছু লুকাচ্ছ।”
—“কী লুকাব?”
—“সেটাই তো জানতে চাইছি।”
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
ইনায়া জানালার বাইরে তাকাল।
—“সবকিছু সবাইকে বলা যায় না, জাইরা।”
জায়রা এবার চুপ হয়ে গেল।
বোনের মুখের দিকে তাকিয়ে তার হাসিটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।
—“তাহলে অন্তত আমাকে বলো। আমি তো সবাই না।”
ইনায়া এবার বোনের দিকে তাকাল।
চোখে এক মুহূর্তের জন্য ভয় ফুটে উঠেছিল।
কিন্তু পরক্ষণেই সেটা লুকিয়ে ফেলল।
—“সময় হলে সব বলব।”
জায়রা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
—“তুমি সবসময় এই একটা কথাই বলো।”
তারপর উঠে দরজার দিকে যেতে যেতে বলল,
—“যাই হোক, কাল কিন্তু আমার সঙ্গে বের হতে হবে।”
ইনায়া অবাক হলো।
—“কোথায়?”
জায়রা রহস্যময়ভাবে হাসল।
—“কাল তোমাকে একজনের সঙ্গে দেখা করাব।”
—“কে?”
—“কাল জানবে।”
—“জাইরা!”
জায়রা হেসে দরজা বন্ধ করে দিল।
ইনায়া কিছুক্ষণ দরজার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর আবার ফোনটা হাতে নিল।
মেসেজটা এখনো সেখানে।
কিন্তু এবার মেসেজের নিচে আরও একটি নতুন লাইন এসেছে।
“আগামীকাল থেকে তোমার জীবন আর আগের মতো থাকবে না।”
ইনায়ার মুখের হাসি পুরোপুরি মিলিয়ে গেল।
পরদিন
সকালটা অদ্ভুতভাবে স্বাভাবিক ছিল।
পাখির ডাক, রোদের নরম আলো, রান্নাঘর থেকে খাবারের গন্ধ—সবকিছুই যেন আগের মতো।
শুধু ইনায়ার ভেতরটা স্বাভাবিক ছিল না।
জায়রা প্রায় জোর করেই তাকে বাইরে নিয়ে বের হলো।
—“তুমি এত চুপচাপ কেন?”
—“এমনিই।”
—“তুমি যখন ‘এমনিই’ বলো, তখনই বুঝি কিছু একটা হয়েছে।”
ইনায়া হালকা হেসে বলল,
—“তুমি বেশি ভাবো।”
জায়রা উত্তর দিল না।
কিছুক্ষণ পর গাড়ি একটা বড় ক্যাফের সামনে থামল।
ইনায়া চারপাশে তাকাল।
—“এখানে কেন?”
জায়রা গাড়ি থেকে নেমে বলল,
—“বলেছি না, একজনের সঙ্গে দেখা করাব?”
—“কে?”
জায়রা শুধু বলল,
—“চলো।”
দুজন ভেতরে ঢুকল।
ক্যাফের এক কোণের টেবিলে একজন ছেলে বসে ছিল।
কালো শার্ট, ঘড়ি, সামনে রাখা কফির কাপ। তার মুখে অদ্ভুত শান্ত একটা ভাব।
জায়রা তাকে দেখেই হাত নাড়ল।
—“আরিশ!”
ছেলেটা মাথা তুলে তাকাল।
তার চোখ প্রথমে জায়রার দিকে গেল।
তারপর ইনায়ার দিকে।
এক মুহূর্তের জন্য তার দৃষ্টি থেমে গেল।
ইনায়াও ছেলেটার দিকে তাকিয়ে রইল।
জায়রা হাসতে হাসতে বলল,
—“ইনায়া, ও আরিশ। আরিশ, এ আমার বোন ইনায়া।”
আরিশ উঠে দাঁড়াল।
—“হাই।”
ইনায়া সামান্য মাথা নেড়ে বলল,
—“হাই।”
জায়রা দুজনের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।
—“ঠিক আছে, তোমরা বসো। আমি খাবারের অর্ডার দিচ্ছি।”
ইনায়া সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—“জাইরা, তুমি কোথায় যাচ্ছ?”
—“খাবার আনতে।”
—“আমিও যাব।”
—“না।”
—“কেন?”
জায়রা হাসল।
—“তোমাদের পরিচয়টা একটু শান্তিতে হতে দাও।”
বলেই সে চলে গেল।
ইনায়া বিরক্ত মুখে তার চলে যাওয়া দেখল।
আরিশ মৃদু হেসে বলল,
—“তোমার বোন সবসময় এমন?”
ইনায়া তাকাল।
—“দুর্ভাগ্যবশত।”
আরিশ হেসে ফেলল।
ইনায়ার মুখেও অল্প হাসি ফুটে উঠল।
প্রথমবারের মতো সকাল থেকে তার মুখে সত্যিকারের হাসি দেখা গেল।
কিন্তু সেই মুহূর্তেই—
তার ফোনটা বেজে উঠল।
ইনায়া স্ক্রিনের দিকে তাকাল।
একটা অচেনা নম্বর।
কল কেটে দিল সে।
দুই সেকেন্ড পর আবার কল।
আরিশ লক্ষ্য করল।
—“ধরবে না?”
ইনায়া শান্ত গলায় বলল,
—“না।”
আবার কল।
এবার ইনায়ার চোখে বিরক্তির বদলে অস্বস্তি দেখা দিল।
সে ফোনটা সাইলেন্ট করে ব্যাগে রেখে দিল।
আরিশ কিছু বলল না।
কিন্তু তার চোখে প্রশ্ন ছিল।
ঠিক তখনই ক্যাফের দরজা দিয়ে আরেকজন ঢুকল।
জায়েন।
আরিশের সবচেয়ে কাছের বন্ধু।
ভেতরে ঢুকেই সে চারপাশে তাকাল।
তারপর আরিশকে দেখতে পেয়ে এগিয়ে এলো।
—“ভাই, তুই এখানে বসে আছিস আর আমাকে বলিসনি?”
আরিশ বিরক্ত হয়ে বলল,
—“তুই নিজেই তো বলেছিলি আজ আসবি না।”
জায়েন চেয়ার টেনে বসে বলল,
—“প্ল্যান বদলেছে।”
তার চোখ এবার ইনায়ার দিকে গেল।
জায়েন ভদ্রভাবে হাসল।
—“হাই। আমি জায়েন।”
ইনায়া মাথা নেড়ে বলল,
—“ইনায়া।”
জায়েন কিছু বলতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই—
ইনায়ার ফোনে একটা নোটিফিকেশন এলো।
সে অনিচ্ছা সত্ত্বেও স্ক্রিনের দিকে তাকাল।
একটা ছবি এসেছে।
ইনায়ার চোখ বড় হয়ে গেল।
ছবিটা তার পুরোনো বাড়ির।
সেই বাড়ি…
যেটার কথা সে বহু বছর ধরে কাউকে বলেনি।
ছবির নিচে মাত্র একটা বাক্য—
“তুমি যত দূরেই যাও, কিছু দরজা তোমার জন্য সবসময় খোলা থাকে।”
ইনায়ার হাত ঠান্ডা হয়ে গেল।
সে দ্রুত ফোনটা বন্ধ করে ফেলল।
কিন্তু এবার আরিশ বিষয়টা লক্ষ্য করেছে।
—“সব ঠিক আছে?”
ইনায়া তার দিকে তাকাল।
কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বলল,
—“হ্যাঁ।”
জায়েনও এবার ইনায়ার মুখের দিকে তাকাল।
কিন্তু কেউ আর কিছু জিজ্ঞেস করল না।
সন্ধ্যার দিকে বাড়ি ফেরার পর ইনায়া নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করল।
আলমারি খুলে একেবারে নিচের ড্রয়ারটা বের করল।
ভেতরে একটা পুরোনো কাঠের বাক্স।
বাক্সটা খুলতেই দেখা গেল—
একটা পুরোনো ছবি।
একটা চাবি।
আর একটা ছোট কাগজ।
ইনায়া ছবিটা হাতে নিল।
ছবিতে ছিল চারজন মানুষ।
কিন্তু ছবিটার সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়—
ছবির এক কোণে ছোট্ট ইনায়া দাঁড়িয়ে ছিল।
সে ছবিটা উল্টে পেছনের লেখা পড়ল।
“যেদিন মায়ার শেষ প্রহর শুরু হবে, সেদিন সত্যি আর লুকিয়ে থাকবে না।”
ইনায়া চোখ বন্ধ করল।
তারপর ধীরে ধীরে ফিসফিস করে বলল—
—“তাহলে… সময় এসে গেছে?”
ঠিক তখনই—
দরজার বাইরে কারও পায়ের শব্দ।
ইনায়া দ্রুত ছবিটা লুকিয়ে ফেলল।
—“কে?”
কোনো উত্তর নেই।
সে দরজা খুলল।
করিডোর ফাঁকা।
কিন্তু মেঝেতে পড়ে আছে একটা কালো খাম।
ইনায়া খামটা তুলে নিল।
খামের ওপর তার নাম লেখা—
ইনায়া।
সে ধীরে ধীরে খামটা খুলল।
ভেতরে মাত্র এক লাইন—
“তোমার গল্পটা তুমি যেখান থেকে শুরু হয়েছে ভাবছ, আসলে সেখান থেকে শুরু হয়নি।”
ইনায়ার চোখ স্থির হয়ে গেল।
আর সেই মুহূর্তে—
বাড়ির নিচতলায় একটা গাড়ি এসে থামল।
গাড়ি থেকে একজন নামল।
তার হাতে ছিল একই রকম একটি কালো খাম।
আর সেই মানুষটি ছিল—
আরিশ।
চলবে…
6 days ago | [YT] | 2
View 1 reply