" ঔপন্যাসিকা.কম "এটি শুধু একটি গল্পের চ্যানেল নয়, এটি অনুভবের একটি জগৎ। এই চ্যানেলে আপনি পাবেন :
হৃদয়ছোঁয়া ছোটগল্প
রহস্যময় থ্রিলার
রোমান্টিক প্রেমকাহিনি
জীবনঘনিষ্ঠ বাস্তব গল্প
প্রতিটি গল্পে আছে অনুভূতির ছোঁয়া, চিন্তার খোরাক আর জীবনের প্রতিচ্ছবি। গল্প যখন শোনা যায়, হৃদয়ে বাজে। সবই সুন্দর বর্ণনায় ও আবেগঘন ভঙ্গিমায় উপস্থাপিত।
প্রতিদিন নতুন গল্প
মনোমুগ্ধকর ভয়েস। চোখ বন্ধ করলেই গল্পের জগতে হারিয়ে যাবেন...
📌📌এখনই সাবস্ক্রাইব করুন এবং গল্পে মেতে উঠুন।
munny - কণ্ঠে গল্প, মনে অনুভব।
please visit my fast channel....
link 🖇️- @গল্পভ্রমর
ঔপন্যাসিকা.কম
#পৌষপার্বণ
#লেখিকা_Irfa_Mahnaj
#পর্বঃ২৭ ........(২)
পার্বণকে বার বার বলার পর ও ওটির সামনে দিয়ে নড়াতে অক্ষম সবাই। ছেলেটা কিছু বলছে না ঠিকই তবে গাঁট হয়ে বসে আছে।
জ্যৈষ্ঠ আস্তে আস্তে পার্বণের পাশ ঘেঁষে বসেন। ওকে জোর করে টেনে নিজের কোলে মাথা দেওয়ায়।
মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে এবার তিনি বলতে আরম্ভ করলেন,
--- তুই যখন জন্ম নিয়েছিস তখন স্বাভাবিক ভাবে হোসনি। ভীষণ অসুস্থ ছিলি। তোকে অবজার্ভবিশনে রাখা হতো। ৭ দিন মা ছাড়া ছিলি। তোকে অক্সিজেন মাস্ক দিয়ে রাখা হয়েছে। তুই পুরো এক মাস অসুস্থ ছিলি। কেমন নির্জীব থাকতি। আমরা তো সবাই টেনশনেই শেষ।
তোর মেজ মা তখন সবে ৭ মাসের অন্তসত্ত্বা ছিলো। পৌষ তখন তার গর্ভে। পৌষের আসার কথা আরো পড়ে থাকলেও পৌষ আমাদের মাঝে তাড়াতাড়ি চলে আসলো।
হয়তো আল্লাহই চেয়েছেন পৌষ আসুক। কারণ এখানে পার্বণ নামের একটা ছেলে যে তাকে ছাড়া অপূর্ন ছিলো। মিরাকেল বললেও ভুল হবে না।
পৌষের জন্মের সাথে সাথে তুই প্রথম বারের মতো কান্না করা থামিয়েছিস। যেখানে ছোট বাচ্চারা কাঁদার পাশে হাসতো সেখানে তুই শুধু কাঁদতি। হয়তো আল্লাহর কাছে কেঁদে কেঁদে পৌষকে চাইতি!
এ পর্যায়ে পার্বণকে জ্যৈষ্ঠর দিকে তাকাতে দেখা যায়। তিনি হালকা হেসে আবারো বলতে শুরু করলেন,
--- সদ্য জন্মানো পৌষকে ১ মাস বয়সি পার্বণের পাশে যখন রাখা হলো হুট করেই কান্না করা ছেলেটা হাসতে আরম্ভ করলো। অলৌকিক ভাবে তুই পৌষ আসার পরেই ধীরে ধীরে সুস্থ হতে আরম্ভ করলি।
সবাই তখন কি বলতো জানিস? সবাই বলতো তুই নাকি পৌষের জন্যই ১ মাস হসপিটালে অপেক্ষা করছিলি। এই আশ্চর্য ঘটনা দেখেই তোদের দাদাসহ আমরা ঠিক করি ভবিষতে তোদের বিয়ে দিবো।
তোদের এক সুতায় বেঁধে দিবো। কারণ আমাদের বোঝা হয়ে গিয়েছিলো পৌষ ছাড়া পার্বণ চলবে না। এখানেই কিন্তু শেষ নয়।
পৌষ যেহেতু সময়ের আগেই জন্ম নেয় তাই ও অপুষ্টিতে ভোগে।ওর শরীর নাজুক। এটা অবশ্য আমার থেকে ভালো তুই জানিস। আমরা সবাই জানি পৌষের বডি খুবই সেনসিটিভ।
আমরা তোদের বিয়ে দিলেও এতো তাড়াতাড়ি তোদের জানাতে চাইনি।তোরা বড় হবি। নিজের পায়ে দাঁড়াবি তারপর না হয় বলতাম।
তবে ভাগ্যে যে অন্য কিছুই লেখা ছিলো। আমি এর গভীরে যাবো না। আমি তোর চাচা হলেও তোর শশুরও হই। মেয়ে আর মেয়ে জামাইয়ের পার্সোনাল বিষয় নিয়ে আমি বলতে চাইনা।
তোরা ছোট তবে এতটাও নয় যে বুঝবি না। তোদের এই কারণেই আমরা এই বিয়ের কথাটা লুকিয়ে গেছি।
এই এতক্ষন পর পার্বণের চোখের কার্নিশ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়লো। জ্যৈষ্ঠ বাচ্চাটাকে নিজের বুকে জড়িয়ে নিলেন।
আরো কিছু বলবেন তবে তার কথা অসমাপ্তই রয়ে যায়। জ্যৈষ্ঠ পার্বণের মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন,
--- আবার সুযোগ হলে আমি আজ যেই কথা গুলো বলতে পারিনি তা বলবো।
ওটির রুমের দরজা খুলে ডাক্তার বেরিয়ে আসে। সবাই ছুটে গেলেও যেতে পারে না পার্বণ।ও ঠায় বসে রয়। কেউ দেখলে বলবে এই ছেলে এতো পাগলামি করেছে!
***********************
পৌষপার্বণ দুজনেই বাচ্চা ছেলে মেয়ে। এই বয়সে এতো বোধ বুদ্ধি থাকলে কাজেই লাগতো। আগের দিনে এতো কম বয়সে বিয়ে অহরহ ছিলো।
যদিও গ্রামে এখনো তার প্রচলন আছে। তবুও শহরে তা অনেক কম। তার থেকেও বড় কথা পৌষ এতো কম বয়সে বাচ্চা ক্যারি করার মতো স্ট্যাবল নয়।
আগে এই বয়সে কিংবা এর থেকেও কম বয়সে মা হলেও অনেক সমস্যার সম্মুখীন হতে হতো মা বাচ্চা দুজনকেই।
আর এখন বর্তমানে এটা খুবই কম। একে তো পৌষ ছোট তার উপর আবার নাজুক শরীর মেয়েটার।
বাচ্চা নেওয়ার মতো ধারণক্ষমতা হলেও এটা পৌষের জন্য রিস্কি। যেখানে ২৪, ২৫ বছর বয়সি মেয়েগুলোর অবস্থাই ঝুকিতে থাকে সেখানে পৌষের জন্য এটা হুমকির মতো।
ওর কন্ডিশনের কথা ভেবে ডাক্তার স্পষ্ট ভাবে জানিয়ে দিয়েছে পৌষকে স্পেশাল কেয়ারে রাখতে হবে। যদিও এখনো পৌষের প্রেগন্যান্সির বয়স বেশিদিন হয়নি তাই আজকের সিচুয়েশন কাটিয়ে উঠা গেছে।
পরিবর্তিতে এরকম কিছু হলে সেটা বাচ্চা এবং মা দুইজেনের জন্যই মারাত্মক লেবেলের ক্রিটিকাল সিচুয়েশন ক্রিয়েট করতে পারে।
ডাক্তারের কথা সবাই শুনলো। ডাক্তার যেহেতু জ্যৈষ্ঠর পরিচিত তাই তিনি কোনো একশন নেননি। জ্যৈষ্ঠ এর জন্য ব্যাপারটা চেপে যাওয়া গেছে।
ডাক্তার আশা এককালের বন্ধু জ্যৈষ্ঠর তাই জ্যৈষ্ঠকে আলাদা ডেকে বলেন,
--- জ্যৈষ্ঠ তুই নিজেও তো ডাক্তার। তোর তো বোঝা উচিত। তোর মেয়ের বয়স মাত্র ১৭!তুই ভাবতে পারছিস ওর বয়স এখন হেসে খেলে কাটানোর ও এ বয়সে মা হচ্ছে! মা হতে গেলে যে কি কি করা লাগে এতটুকু জ্ঞান হবার ও তো টাইম দিবি? এসব ও বাদ সময়ের সাথে নাহয় শিখে যাবে। কিন্তু তুই নিজেও জানিস মাতৃকালীন সময়টা কতটা সেনসিটিভ!
আশার ঝাড়ি শুনে মুখ চোখ এটুকু করে দাড়িয়ে রয় জ্যৈষ্ঠ। সে কি জানে না এসব? আলবাত জানে। কিন্তু ওর হাতে কিছু আছে নাকি!
আশা এবার জ্যৈষ্ঠর উদ্দেশ্য শুধায়,
--- আর তোর জামাইয়ের ও বলি হারি কান্ডজ্ঞান। কোথায় সে তাকে আজ কয়েকটা কথা শুনাই।
একটু দুরেই দেবদাস হয়ে থাকা পার্বণের দিকে তাকিয়ে কাচুমাচু ভঙ্গিতে হাত দিয়ে পার্বণকে দেখিয়ে দিলো জ্যৈষ্ঠ।
আশা ভেবেছিলো পৌষের বড় কারো সাথে বিয়ে হয়েছে। কিন্তু জামাইয়ের জায়গায় বাচ্চা ছেলে দেখে আকাশ থেকে ধপাস করে পড়ে আশা।
অবিশ্বাস্য গলায় বলে উঠে,
--- এখন এটা বলিস না এটা তোর মেয়ের জামাই!
জ্যৈষ্ঠর দিকে তাকাতেই ও অসহায় মুখ বানিয়ে মাথা নাড়ায়। মাথা চক্কর দিয়ে উঠলো আশার।
--- বাচ্চা বাচ্চা ছেলে মেয়ে দুটোর বিয়ে দিয়েছিস! তার উপর বাচ্চার পেট থেকে বাচ্চা! তোদের নামে তো বাল্যবিবাহের কেস করা লাগবে।
--- ওদের নিজেদের এখন ফিটার খাওয়ার বয়সে বাচ্চা পালবে!হাহ জ্যৈষ্ঠ তোর থেকে আশা করিনি এটা।
জ্যৈষ্ঠর এখন চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করছে,
--- ওরে তোরই যদি এই রিঅ্যাকশন হয় তাহলে বোঝ প্রথম শুনে আমাদের কি অবস্থা হয়েছিলো।
তবে আপাতত চেপে গেলো সেসব। আর আশা? তার মাথা ভন ভন করে ঘুরছে। এখন তাই গেছে রেস্ট নিতে। ভেবেছিলো পৌষের হাসব্যান্ডকে তুলোধোনা করবে। বড় হয়ে কিভাবে এমন বেকুবের মতো কাজ করতে পারলো?
কিন্তু নিজেই এখন বেকুব বনে গেছে। এরে এখন কি বলবে নিজেই তো ছোট! বুঝের ব ও তো হয়নি এখনো এই ছেলের মাঝে।
___________
চলবে~
"ইরফা মাহনাজ"
3 days ago | [YT] | 22
View 5 replies
ঔপন্যাসিকা.কম
#পৌষপার্বণ
#লেখিকা_Irfa_Mahnaj
#পর্বঃ২৭
মানুষের জীবন খড়স্রোতা নদীর ন্যায়। এই ভালো তো এই খারাপ। এতো কিছুর মাঝেও বারোমাসি নীড়ে কখনো দুঃখ কি জিনিস তা দেখা যায়নি।
শুনতে হাস্যকর লাগলেও এ বাড়িটি সবসময় হাসি ঠাট্টা আর মজায় মাতোয়ারা হয়ে থাকে। এই পরিবারের সবার মজার আর হাস্যরসাতকে মুখরিত থাকে বাড়ির প্রতিটি দেওয়াল আনাচ কানাচ।
সবসময় হাসি মজায় সুখে থাকে বলেই যে দুঃখ এদের ছুঁতে পারবে না এমন তো কোনো কথা নেই। জীবনে দুঃখ থাকবেই। সুখ থাকলে দুঃখ থাকবে আবার দুঃখ থাকলে সুখ!
চেঁচামেচির আওয়াজ শুনে উপরের তলা দিয়ে আসতে গিয়ে সিঁড়ি থেকে পড়ে যায় পৌষ। একটু দ্রুতই সে আসতে চেয়েছিলো ফলাফল পায়ের সাথে পা বেজে সিঁড়ি থেকে গড়িয়ে পড়ে যায়।
পৌষের আর্তনাদ করে করা একেকটা চিৎকার পার্বণের বুকে তীরের মতো বিধছে। ছেলেটা স্থির হয়ে দাড়িয়ে আছে।
ওর পা বোধহয় আটকে গেছে। মস্তিস্ক কাজ করছে না। এতক্ষণ মায়ের হাতে এতো গুলো মার খেয়েও দাঁত কেলিয়েছে যেই ছেলেটা সেই ছেলেটাই এখন পাথর হয়ে গেছে!
বাড়ির প্রত্যেকটা সদস্য স্থির। মাত্রই তাদের সামনে ঘটে যাওয়া ঘটনাটা বুঝতে তাদের সময় লাগছে।
ফাল্গুনের হাত থেকে খুন্তি পড়ে গিয়ে ঝনঝন আওয়াজ করে উঠলো। এতেই সবাই যেনো তাদের ভ্রম থেকে বেরিয়ে আসে।
পার্বণের মাথায় শুধু একটা কথাই বাজছে পৌষের চিৎকার করে বলা 'ওমাগোওওও"! তার মন ও মস্তিস্ক তাকে বারংবার সিগন্যাল দিচ্ছে পৌষ পড়ে গেছে, তার পৌষ এই অবস্থায় পড়ে গেছে! তার পৌষ ব্যথা পেয়েছে
ব্যাস এটুকুই যথেষ্ট ছিলো ছেলেটাকে উন্মাদ করে দিতে। ত্রস্ত পায়ে দৌড়ে পৌষের কাছে চলে গেলো।
কিভাবে যে পার্বণ পৌষের কাছে তা সে নিজেও জানে না। ছেলেটার পুরো শরীর কাঁপছে। হাতটা এতো অসম্ভব পরিমানে কাঁপছে ও ঠিক করে ধরতেও পারছে না।
তড়িঘড়ি করে পৌষকে নিজের বক্ষে নেয়। পৌষ জ্ঞান হারিয়েছে। ওর মুখটা দুই হাতে ধরে ওকে জাগানোর চেষ্টা করছে পার্বণ।
আর ওর পরিবার তারা তো পার্বণের প্রথম চিৎকারেই এসে পৌষের কাছে দাড়িয়েছে। তবে ছেলেটা কাউকে ধরতেই দিচ্ছে না।
পার্বণ নিজেও বাচ্চা ছেলেই। ১৭ বছরের ছেলেটা আহামরি বড় নয় যে এতো বেশি স্টেবেল হবে। ফাল্গুন ছেলের নিকট এগিয়ে গেলো।
পৌষকে ডাকতে ডাকতেই মায়ের পানে তাকায় পার্বণ। ছেলের লাল টকটকে চোখের দিকে তাকিয়ে বুকটা ধক করে উঠে ফাল্গুনের।
একটু আগেও মার খেয়ে ও যার চোখে জলের রেশ মাত্র দেখা গেলো না সেই ছেলেই এখন কান্না করছে।
--- ম... মা প... পৌষ চোখ খুলছে না কেনো।
ভাদ্র বোনের এই অবস্থা দেখে কি করবে দিশা পাচ্ছে না। পৌষের হাতধরে দাড়িয়ে বসে আছে।
বর্ষা আর জ্যৈষ্ঠ বাসায় নেই। বর্ষার বান্ধবী অসুস্থ ওখানেই আছে। বেশি রাত হয়ে যাওয়ায় আর বাসায় আসেনি। আর জ্যৈষ্ঠ বউকে একলা ছাড়বে না তাই সেও হসপিটালেই থেকে যায়।
এরকম একটা সিচুয়েশনে সবাই ভেঙ্গে পড়লে কাজ হবে না। তাই চৈত্র বুদ্ধি খাটিয়ে প্রথমে নিজের স্বামীর কাছে যায়। বলে,
--- ভাদ্র উঠ এভাবে বসে থেকে কোনো কাজ হবে না। পৌষ এখন স্বাভাবিক অবস্থায় নয় ওকে আমাদের হসপিটালে নিতে হবে।
চোখের পানি মুছে বউয়ের দিকে তাকায় ভাদ্র। বাচ্চাদের মতো ঠোঁট ফুলিয়ে বলে,
--- চৈত্র আমার বোন...!
চৈত্রের নিজেরও কষ্ট হচ্ছে তবে এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। এদের সবার বেহাল দশা দেখে ওর বোঝা হয়ে গেছে যা করার ওকেই করতে হবে।
পৌষের পা ঢলছিলো মাঘ। ওকে উদ্দেশ্য করে চৈত্র বলে,
--- ছোট মা প্রয়োজনীয় জিনিস গুছাও।
হাত দিয়ে চোখের পানি মুছে মাঘ গেলো সব গুছাতে। পৌষ সবার আদরের উপরন্তু সন্তানসম্ভাবা এই অবস্থায় এরকম সবাই স্তব্ধ।
চৈত্র এবার গেলো তার ছোট দুই ভাইয়ের কাছে। ওদের উদ্দেশ্য বলল,
--- হেমন্ত বাবাকে গিয়ে বলো তিনি অ্যাম্বুলেন্স কল করতে। তিনি বোধহয় আওয়াজ পাননি। আর বসন্ত গিয়ে পানি নিয়ে এসো।
দুই ভাইই উদভ্রান্তের মতো দৌড়ালো। বসন্ত গিয়ে পানি নিয়ে আসলে তা ছিটিয়ে দিলো পৌষের চোখে মুখে।
তবুও জ্ঞান না ফিরায় সবার কলিজার পানি শুকিয়ে গেলো। পার্বণ পৌষকে ধরে বিলাপ শুরু করে দিলো। বলতে গেলে ছেলেটা পুরো বাড়ি মাথায় তুলে ফেলেছে।
সবাইকে সামলানো গেলেও পার্বণকে সামলানো যাচ্ছে না। ও পৌষকে ঝাঁকিয়ে জিজ্ঞেস করে,
--- এই পৌষ জান তুই ঠিক আছিস? কোথাও লাগেনি তো? কিছু তো বল। আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে।
বোকা ছেলে যার জ্ঞান নেই সে কি উত্তর দিতে জানে!এতো কিছু ভাবার সময় কই পার্বণের ও তো কাঁদতে কাঁদতে চোখ মুখ লাল করে ফেলেছে।
তারপর বৈশাখ আসলে সে নিজের অর্ধাঙ্গিনীকে সামলায়। পৌষকে হসপিটালে নেওয়া হয়। এমন সিচুয়েশনে সত্যিই বসে থাকা যায় না।
আষাঢ়ও প্রায় দৌড়ে দৌড়ে এসেছে। ভাতিজা ভাতিজির এই অবস্থায় সে নিজেও কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। সকালে হাঁটতে বের হয়েছিল সেখান থেকেই এসেছে।
যে যেভাবে ছিলো সেই অবস্থাতেই রওনা দেয় হসপিটালে। তাদের এতো খেয়াল করার সময় কই।
পার্বণ তো জুতা ছাড়া খালি পায়েই পৌষকে কোলে করে অ্যাম্বুলেন্স এ নিয়ে যায়। দুজন ওয়ার্ড বয় এসেছিলো তবে তাদের নিকট পৌষকে দিতে নারাজ পার্বণ।
এই অবস্থায় ও বউয়ের প্রতি পসেসিভনেস এক ফোটাও কমেনি। ওই অবস্থাই খালি পায়ে জুতা ছাড়া পৌষের সাথে চলে যায় পার্বণ।
যেখানে তার পুরো দুনিয়া জ্ঞান হারিয়ে পড়ে আছে সেখানে এতো কিছু খেয়াল করার সময় আছে নাকি।
ফাল্গুন এক পলকের জন্যও ছেলের কাছছাড়া হননি। আর পার্বণ সেতো পৌষকে নিজের বুকের মধ্যে রেখেই সারা রাস্তা পারি দিয়েছে।
বাড়ির সবাই চিন্তিত। ওদের সবার চোখে পানি। বারোমাসি নীড়ে কখনো ঝগড়া হতে দেখা যায়নি। বাড়ির একজনের কিছু হলেই সবাই কেঁদেকুটে ভাষায় অস্থির হয়ে যায়। এই নীড়ের বন্ডিংই এতো স্ট্রং।
*********************
পৌষকে জ্যৈষ্ঠর হসপিটালেই আনা হয়েছে। মেয়ের এই অবস্থা দেখে ভাষা হারিয়ে ফেলেন জ্যৈষ্ঠ। এতবছর ডাক্তার জীবনে এই প্রথম বার জ্যৈষ্ঠর হাত কাঁপছে কোনো রুগীর চিকিৎসা করতে।
যতই সে ডাক্তার হোক। যত বড়ই ডাক্তার হোক না কেনো মেয়ের এমন অবস্থা কোনো বাবাই মেনে নিতে পারে না।
জ্যৈষ্ঠর পিতৃহৃদয় কেঁপে উঠে। জ্যৈষ্ঠর অবস্থা যে খুব একটা সুবিধার না তা বুঝতে কারোরই বাকি থাকে না। জ্যৈষ্ঠর সহকর্মী ডাক্তার তাই তাকে পৌষের চিকিৎসার কাজে কোনো ভাবেই ইনভল্ভ করে না।
জ্যৈষ্ঠ নিজেও বোধহয় পারতো না। শত হোক বাবা তো! পৌষের থেকেও ক্রিটিকাল রুগীকে হ্যান্ডেল করতে পেরেছে আর আজ? মনের জোর তো ধূর কোনো সাহসই পাচ্ছে না।
বর্ষা এমনিতেই গত রাত অনেক রাত অবধি জেগে ছিলেন। যেই বাড়ি ফিরতে নিয়েছে তখনই দেখে তার নারী ছেড়া ধন, তার বুকের মানিকের এই অবস্থা!
কোনো মাই সহ্য করতে পারেনা। বর্ষা এর ব্যাতিক্রম হয় কিভাবে?এর মাঝে আবার কাল থেকে তার উপর দিয়ে একটার পর একটা যাচ্ছে। আর আজ এই অবস্থা।
ঠিক আর থাকতে পারেনি। জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়ে। মায়ের এই অবস্থা পৌষের অবস্থা সব মিলিয়ে পাগলপ্রায় ভাদ্র।
এসবের মাঝেও চৈত্র সর্বদা সব সময় সামাল দিচ্ছে সব। আষাঢ় নিজের বড় দুই ভাইকে সামলাচ্ছে। মাঘ আর ফাল্গুন বর্ষার কাছে।
বর্ষাকে একটা কেবিনে দেওয়া হয়েছে। সেলাইন চলছে। ঘুমের ওষুধ দিয়েছে। আপাতত বর্ষার জন্য এটাই ঠিক মনে হয়েছে।
বসন্ত ও হেমন্ত দুই ভাই পার্বণের দুই পাশে বসে আছে। চেষ্টা করছে পার্বণকে সামলাতে। যেই ছেলেটা সবসময় আজব আজব কথা বলে সবাইকে মাতিয়ে রাখে আজ তার মুখে কোনো বুলি নেই।
চঞ্চল ছেলেটা আজ নির্জীব। মূর্ছা যাওয়া। যার মধ্যে নেই কোনো সজীবতা। অথচ এই পার্বণের ভণ্ডামির রেকর্ডের কোনো শেষ নেই।
আজ সে চুপ। মাথা নিচু করে থুতনিতে দুই হাত ঠেকিয়ে বসে আছে। ওর কিচ্ছু ভালো লাগছে না। ওর পৃথিবীটা সামনের ওটিতে।
পার্বণের এই নিস্তব্ধতা কেউ মেনে নিতে পারছে না। ছেলেটা অস্বাভাবাবিক ভাবে চুপ। এ যে ভালো লক্ষণ নয়। চৈত্র এতক্ষনের কঠিন খোলস ছেড়ে বাইরে বের হয়ে আসে।
ভাইকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে দেয়। এতেও ভাই তার কথা বলছে না। পার্বণকে তো দুস্টুমিতেই মানায় সে শান্ত থাকবে কেনো?
সবার অবস্থা খারাপ তবুও তাদের এখন চিন্তা পার্বণকে নিয়ে। ও নিতান্তই বাচ্চা। ওর বুঝই বা কতটুকু। সেই যে ঘরে বসে কেঁদেছে তার পর অ্যাম্বুলেন্সে বসে থেকে এই পর্যন্ত আর একটুও কাঁদেনি।
পাথর হয়ে বসে আছে। ফাল্গুন ছেলেকে বুকে জড়িয়ে কেঁদে দিলেন। চিন্তায় আছে সকলে এই ছেলে আবার কোনো ট্রমায় না চলে যায়।
--- এই আব্বা? তুমি কাঁদছো না কেনো? কিছু বলো মায়ের সাথে কথা বলো।
কিন্তু কিসের কি?পার্বণ সে নির্জীব। সবাই এগিয়ে আসলো। এটা সেটা বলেও একটা বুলি বের করতে পারলো না।
এ বারে জ্যৈষ্ঠ এগিয়ে এলেন। তার নিজের অবস্থা যাই হোক এখন তার সেদিকে দেখলে চলবে?
ওদিকে মেয়ে পড়ে আছে ওটিতে এদিকে ভাতিজা সাথে মেয়ে জামাইয়ের এই অবস্থা। কিছু না হোক চেষ্টা তো করাই যায়। এভাবে হাত পা গুটিয়ে বসে থাকার কোনো মানে নেই।
বৈশাখ যে কিনা সব সময় ছেলেকে খোঁচায় সেও ছেলের এই দশা দেখে কি করবেন বুঝে উঠতে পারছেন না।
পার্বণ আর বৈশাখ বাপ ছেলের মধ্যে সারাক্ষন ইন্ডিয়া পাকিস্তানের মতো অবস্থা বিরাজ করলেও আজ ছেলের করুন পরিণতি পিতৃমন কাঁপিয়ে তুলেছে।
**********************
3 days ago | [YT] | 14
View 4 replies
ঔপন্যাসিকা.কম
#পৌষপার্বণ
#লেখিকা_Irfa_Mahnaj
#পর্বঃ২৬
মাঝরাতের সেই কাহিনীর পর বাসায় এসে শুয়ে পড়ে পৌষপার্বণ।দেরি করে ঘুমানোর জন্য এখনো ঘুমোচ্ছে দুটোতে।
পৌষ কাত হয়ে একপাশে শুয়ে আছে। আর ওকে পেছন থেকে পেঁচিয়ে ধরে ওর ঘাড়ে মুখ গুঁজে রেখে বেঘোরে ঘুমোচ্ছে পার্বণ।
পৌষের মাথার কাছে বালিশের সাথে ওর ওড়না আর পার্বণের টিশার্ট রাখা। ঘুমানোর আগেই ফের খুলে রেখেছিলো পার্বণ। ওর নাকি গরম লাগে।
এমনিতেই কিশোর ছেলে এখন এদের রক্ত থাকে গরম তার উপর জেন-জি এদের আর নখড়ার শেষ নেই।
ঘুমের মাঝে একটু নড়ে চড়ে পৌষের পায়ের মাঝে নিজের পা ভালো ভাবে ঢুকিয়ে ওকে আরেকটু জাপ্টে নিজের সাথে জড়িয়ে ধরে পার্বণ।
ঘাড়ে চুমু এঁকে দেয় বোধহয় কি জানি ঠোঁট জোড়া তো তেমনি নড়লো। এই ছেলের ঘুমের মাঝেও কোনো শান্তি নেই।
এ পারলে ঘুমের মাঝেও হাডুডু খেলে। অবশ্য এখন সমস্যা না হলেও পেট আরেকটু বাড়লেই পৌষ নিজের আগের রুমে শিফট হবে। কারণ পার্বণের ঘুমানোর ধরণ খুব বাজে।
ও পুরো খাট নিয়ে ঘুরবে। কখনো পৌষ ঘুম থেকে উঠে দেখে ওর পায়ের সাথে পার্বণের মুখ তো কখনো পৌষকে লাথি দিয়ে ফেলে দেয়।
এমনও অনেক সময় হয় পার্বণ ওর পুরো শরীর সহ পৌষের উপর উঠে পড়ে আর বেচারি দম নিতে না পেরে দেখে এই অবস্থা। তারপর আর কি ওকে ঠেলে, ধাক্কা দিয়ে নিজের উপর থেকে সরায়।
অনেক সময় তো পৌষকে ভর্তা বানিয়ে ওর দফারফা করে দেয়। এ কারণে পৌষ কোনো রিস্ক নিতে পারবে না।
এইযে দুই বান্দা কি সুন্দর নিষ্পাপ বাচ্চাদের মতো ঘুমিয়ে আছে কেউ বলবে এরা এতো জাউরামি জানে? রাতে ভণ্ডামি করে এসে এখন ক্লান্ত হয়ে বিশ্রান নিচ্ছে। ভণ্ডামি করায় যদি টাকা পয়সা থাকতো এতো দিনে টাকার বান্ডিল ঘুমিয়ে থাকতো এই দুই জাউড়া।
এরা নাকি আবার হবে বাপ মা! বাচ্চা কি জাউরামি করবে বাপ মাই জাউরামি করে ওদের অতিষ্ট করে তুলবে।
**********************
ঘুমের মাঝে হঠাৎ করে এমন চিৎকার শুনতেই খাটের কিনারে অর্ধেক ঝুলে থাকা বসন্ত ধপ করে মাটিতে পড়ে গেছে।
এক হাত আর এক পা বেড থেকে বাহিরে ঝুলিয়ে শুয়ে ছিলো বসন্ত। এমনিতেও একটু পড়ে এই ছেলে পড়েই যেতো।
--- ওমা গোওওও! কে এতো সকাল বেলা চেঁচায় রে!
কোমর ধরে আর্তনাদ করে উঠলো বসন্ত। বেচারার ভাগ্যটাই খারাপ। সারাদিন ওর আগে পিছে ঝামেলা খালা খালি ঘুরবে।
বসন্ত বুঝে পায় না। শান্তির মায়ের শান্তির বাপের সাথে ঝগড়া হওয়ায় সে বসন্তের জীবনে থাকে না কিন্তু ঝামেলা খালা কেনো ওকে ছাড়তে চায় না।
দুই হাত তুলে আড়মোরা ভেঙ্গে রুম থেকে বের হয়ে গেলো বসন্ত।
এদিকে সারারাত বনচাঁপার রাগ ভাঙাতে ভাঙাতে মোবাইলের চার্জ শেষ প্লাস ওর নিজেরও চার্জ শেষ । কোন ছাতা করতে যে বাতাসি নামক বাতাসের হেল্প করতে গিয়েছিলো!
হোয়াটস্যাপ এ ১২০০+ প্লাস ম্যাসেজ দিয়েছে বোধহয়। ম্যাসেঞ্জারেও ম্যাসেজের বন্যা বইয়ে দিয়েছে। কল এমনে ম্যাসেজ কিন্তু সব জায়গা দিয়েই নো রিপ্লাই, নো রেসপন্স।
সিনিয়র পটাতে যে কেনো এতো কষ্টওওওওও!পটানের আগেই না সব শেষ হয়ে যায়!
হেমন্তের এখন কান্না পাচ্ছে রীতিমতো। ও পারলে হাত পা ছড়িয়ে ছিটিয়ে কান্না করে। গতরাতে পূর্ণা যদি না বলতো তাহলে তো এও জানতে পারতো না।
জেলাস ও হবে আবার হেমন্ত তার কাছে গেলে এমন একটা ভাব ধরবে যেনো হেমন্তকে দেখতেই পারে না। মানে ভাঙবে তবু মচকাবে এমন হয়েছে দশা।
এই নারী জাতিকে কখনো বোঝাই যায় না আর সিনিয়র জাতি তো আরো এক ধাপ উপরে। এখন সামনাসামনি দেখা করে রাগ ভাঙাবে আর কি করবে এছাড়া।
বেচারার ভাগ্যে বোধহয় শান্তিতে টেনশন করাও নেই। চিৎকারের আওয়াজে ওর কানের ভিতরের সব নড়ে গেছে। কোনো রকমে স্লিপার পড়ে দৌড়।
**************************
চিৎকারের এই আওয়াজ ভাদ্রদের রুমেও এসেছে। মানে গোটা বাড়ি এক চিৎকারে উঠে পড়েছে।
পাশ হাতড়ে কোনোরকমে টিশার্ট গায়ে গলিয়ে হাঁটা দেয় ভাদ্র। অর্ধেক পথ যেতেই ওকে থামতে হয় চৈত্রের কথা শুনে।
আসলে রাতের বেলায় ভাদ্র আর চৈত্রের মাঝে কিছু মিছু হওয়ার কারণে ভাদ্রের টিশার্ট ভাদ্র চৈত্রকে পড়িয়ে দেয়।
আর নিজে খালি গায়ে ছিলো। সকালে এমন চিৎকার শুনে কোনো কিছু খেয়াল না করেই চৈত্রের লেডিস টিশার্ট যেটা হাটু অবধি পড়ে সেটা পড়েই হাঁটা দেয়।
চৈত্র বিছানায় গড়াগড়ি করে হাসছে। হাসতে হাসতেই শুধায়,
--- আমার ওড়নাটাও নিয়ে যা। ভাবিনি আমার গেঞ্জি যে আমার থেকে তোর গায়ে বেশি ভালো মানাবে।
এই বলেই নিজের ওড়নাটা ভাদ্রের দিকে এগিয়ে দিলো চৈত্র। ভোঁতা মুখ করে দাড়িয়ে রইলো ভাদ্র।
এগিয়ে গিয়ে চৈত্রের গেঞ্জি খুলে ওর মুখে ছুড়ে মেরে ওয়াড্রপ থেকে নিজের শার্ট নিয়ে পড়ে ভাদ্র।
তারপর হনহন করে বেরিয়ে যায়। যাওয়ার আগে আবার টিপ্পনী কাটতে ভুলে না।
--- কিছু কিছু মানুষের মুখটা সবসময় অকাজের কথাই বলে। তারা বোধহয় জানে না মানুষ মাত্রই ভুল।
--- আর কিছু মানুষের মেয়ে সাজার ভুত এখনো নামেনি। ছোট বেলার মতো এখনো সে আমার জামা কাপড় পড়তে পছন্দ করে।
ছোট বেলায় ভাদ্র প্রায় চৈত্রের জামা পড়ার জন্য কান্না করতো। নিজের জামা ছেড়ে সারাক্ষণ চৈত্রের জামা পড়ে থাকতো। ওর মতো সাজতো।
সেই নিয়েই খোটা দিলো এখন চৈত্র। থমথমে মুখ নিয়ে এবার বেরিয়ে গেলো ভাদ্র।
*************************
চিৎকারের কারণে পুরো বাড়ি রান্নাঘরের সামনে হাজির তবে যার জন্য চিৎকার ছিলো সেইই এখনো হাজির হতে পারেনি।
সকাল বেলা ফাল্গুন, বর্ষা এসেছে রান্নাঘরে।এসেই পুরো চারশো বিশ ভোল্টের বিদ্যুৎ শক খেলো।
এটা রান্নাঘর!ফাল্গুনের তো মাথায় হাত। তার সাধের রান্নাঘরের এমন করুন দশা দেখে। তবে তার এটা বুঝতে একটুও সময় লাগে না এই আকাম করছে কে।
এসব জাউরামি পার্বণ জাউড়া ছাড়া কেউ করতেই পারবে না। সবাই আসলেও পার্বণ না আসতে উনি চেঁচিয়ে উঠলেন আবারো।
--- জাউড়া পোলায় জাউরামি কইরা এখন গেছে কই? জাউড়ার জাউরামি, ভণ্ডামি না করলে বুঝায় ওর পেটের ভাত হজম হয় না।
--- কি হচ্ছে কি এখানে? মনে হচ্ছে আমাকেই খোজা হচ্ছে।
খুব ভাবের সাথে কথাটা বলতে দেরি পার্বণের কিন্তু ওর মুখের উপর ফাল্গুনের ডাল ঘুটনি মারতে দেরি হয় না!
___________
চলবে~
"ইরফা মাহনাজ"
3 days ago | [YT] | 15
View 5 replies
ঔপন্যাসিকা.কম
#এক_দেখায়
#পর্ব_২৭............(৩)
#সুরভী_আক্তার
" রুহি..
তুমি কোথায় যাচ্ছ ? তুমিও এখানেই থাকো প্লিজ ! ভালো লাগছে !
রুহি ঘাঢ় বাঁকিয়ে তাকালো শান্তর দিকে । শান্ত আধো চোখ খুলে মুচকি হেসে চোখের ইশারায় থাকতে বললো ওকে ।
রাত ১০ টা পেরিয়েছে । রাতের ডিনার শেষে ঘরে এসেছে মিহি । মনটা কেমন ছটফট করছে । স্থির থাকতে পারছে না ও । একটু আগে রুহির সাথে কথা হলো । কাল টিউশন আসবে । অনেক সময় ঘোর প্যাঁচ কথা বলার পরেও রাফির বিষয়ে একটা কথাও বলে নি মিহি । গলায় এসে দ্বিধায় আটকে যাচ্ছিল কথা গুলো । অস্বস্তি হচ্ছিল ভীষণ । রুহিও আগ বাড়িয়ে কিছু বলে নি । ও চাইছিল মিহি আগে থেকেই জিজ্ঞেস করুক । কিন্তু না , মিহি তো তা করলো না । কথা শেষে ফোন কাটলো দু'জনে ।
মিহির খারাপ লাগছে ভীষণ । ওর জন্যেই তো হয়েছে সব কিছু । হসপিটাল থেকে এসেছে থেকে একটা বারও খোঁজ নিলো না রাফির । এটা বেমানান । খোঁজ নেওয়া টা দরকার ।
মিহি ঘরের মধ্যে অস্থির ভাবে পায়চারি করলো কিছুক্ষণ । রাফির নাম্বার আছে ওর কাছে । অনেক ভেবে শ্বাস টেনে সাহস জোগালো নিজেকে । কুন্ঠা ঠেলে প্রথম বারের মত ডিরেক্ট ফোন লাগালো রাফির নাম্বারে । কাঁপা হাতে ফোন তুললো কানে । গলা অবধি কাঁপছে ।
এদিকে রাফির ফোন শব্দ করে বেজে উঠতেই কপাল কুঁচকায় রাফি । অনেক দিন পর পরিবারের সাথে গল্প গুজবে বসেছে সে । ড্রইং রুমে উপস্থিত আছে সবাই । আফসানা বেগম আর শান্তও আছে এখানে । সন্ধ্যার দিকে জাকির হোসেন ও এসেছেন । পুরো পরিবার মিলে আড্ডা বসিয়েছে রাতের খাবার শেষে ।
রাফি শান্ত হয়ে বসে ছিল এতক্ষন । ফোনের শব্দে কপাল কুঁচকে পকেট থেকে ফোন বের করে । অমনি ফোনের ক্রিনে ভেসে ওঠা 'Blossom' নামে সেভ করা নাম্বার দেখে গোটানো কপাল শিথিল হয় আপনা আপনি । অবাকের সাথে সাথে ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে ওঠে । পাশ থেকে রাশেদ রায়হান চৌধুরী রাফি কে উদ্দেশ্য করে বলেন...
" কে ফোন করেছে বাবা ?
রাফি ফোনটা হাতের মুঠোয় নিয়ে ঘন পলক ফেলে উঠে দাঁড়ায় সোফা ছেড়ে । শান্ত ঠোঁট কামড়ে উঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করে । রাফি স্বাভাবিক কন্ঠে বলে...
" তেমন কেউ না আব্বু , আমি একটু কথা বলে আসছি !
বলেই বড় বড় পা ফেলে উঠতে থাকে সিঁড়ি বেয়ে । উঠতে উঠতেই ফোন কেটে গেছে । রাফি প্রথম বার ফোন রিসিভ না করায় মিহি আবারো ডায়াল করে । এবার ঘরে গিয়ে সোফায় গাঁ এলিয়ে দিয়ে ফোনের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে ফোন রিসিভ করে রাফি । ফোন রিসিভ করে কেউ কোন কথা বলে না । দু'জনেই একে অপরের কথা বলার অপেক্ষায় আছে । কয়েক সেকেন্ড পর মিহি নরম কন্ঠে সালাম দেয়...
" আ..আসসালামুয়ালাইকুম..!
রাফি মুচকি হাসে । গলা ভারী করে উত্তর দেয়...
" ওয়ালাইকুমুস সালাম..!
" কেমন আছেন এখন ?
রাফি আবারো ভারী গলায় উত্তর করলো..
" জ্বি আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি ! কিন্তু আপনি কে ? আপনাকে তো চিনলাম না ?
থতমত খেলো মিহি । অপ্রত্যাশিত প্রশ্নে কিঞ্চিত অবাক হলো । ভ্রু যুগল কুঁচকে এলো আপনা আপনি । রাফি ওকে চিনতে পারলো না ? নাম্বার না চিনুক ওর গলার স্বর ও চিনলো না ? কিন্তু নাম্বার তো চেনার কথা ! রুহি তো অনেক সময় রাফির ফোন থেকে কল করে মিহিকে । তবুও রাফি চিনলো না ।
মিহি গলার স্বর অবধি ও চিনলো না । এতে খারাপ লাগার সৃষ্টি হলো মিহির মনে ।
চোখ মুখে ভাঁজ পড়লো ।
মিহি সময় নিয়ে গলা স্বাভাবিক করে বলল...
" আমি,, চিনতে পারেন নি ?
রাফি আবারো অচেনার ভান করে ঠোঁট চেপে বললো...
" না তো ! কে আপনি ? আপনি আমায় চেনেন ? আর আমার নাম্বার কোথায় পেলেন ?
দেখুন আমি কিন্তু অচেনা, অজানা মেয়েদের সাথে কথা বলি না ।
মিহির খারাপ লাগা বারলো । বুকের ভেতর অদ্ভুত চিনচিনে ব্যাথা অনুভব হলো । গলা জড়িয়ে আসলো আপনা আপনি ।
ঠোঁট উল্টে ধৃষ্ট স্বরে বলল...
" ঠিক আছে , কথা বলতে হবে না । রাখি..!
বলেই কান থেকে ফোন নামালো মিহি । চোখের কোনে পানি জমেছে অজান্তেই । ফোন কাঁটার আগে রাফি ডাকলো...
" শুনুন...
মিহি থমকালো । বারবার এই স্বর থমকে দেয় মিহি কে । তবে এবার নিজেকে সামলে নিলো মিহি । কথা বললো না । ফোন টাও কানে তুললো না । মুখের সম্মুখে ধরে রইলো । মিহির সাঁড়া না পেয়ে রাফি বললো...
" ঐ যে আপনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন না যে আমি কেমন আছি , এর পরিবর্তে আমার ও জিজ্ঞেস করা উচিত আপনাকে । তা আপনি কেমন আছেন ?
মিহি দাঁত পিষে কাঠখোট্টা স্বরে জবাব দিলো ..
" একটা অচেনা অজানা মেয়ে কেমন আছে সেটা আপনার না জানলেও চলবে !
বলেই ক্ষিপ্ত হয়ে টুং টুং করে ফোনটা কেটে দিলো মিহি । সেটা ছুড়ে মারলো খাটের এক পাশে । গোমড়া মুখে উবু হয়ে বালিশ জড়িয়ে শুয়ে পড়ল ।
এদিকে ফোন কাটতেই রাফি ভড়কালো । বেশি বেশি হয়ে গেলো বোধ হয় । এমনটা করা উচিত হয় নি হয়তো । মেয়েটা প্রথম বার ফোন করলো, আর এভাবে ওর সাথে কথা বলাটা কি ঠিক হলো ? এবার রাফির নিজের ও খারাপ লাগলো ।
★
পরদিন ঠিক দুপুর দুটোর দিকে টিউশন ছিলো । বাড়ির গাড়িতেই মিহি সহ রুহি একই সাথে টিউশনে এসেছে । মিহি আজ বড্ড চুপচাপ । হিসেব করে কথা বলছে । হিসেবের বাইরে একটা কথাও বলছে না । কেমন গম্ভীর হয়ে আছে । রুহি লক্ষ্য করেছে সেটা । তবে এই বিষয়ে কিছু জিজ্ঞেস করে নি । ভেবে রেখেছে একেবারে টিউশনের পর জিজ্ঞেস করবে ।
রাফি আজ অফিসে আসে নি । ওকে আসতে দেওয়া হয় নি । ক'দিন রেস্ট করার জন্য অফিস থেকে এক প্রকার ছুটি দেওয়া হয়েছে ওকে ।
টিউশন শেষ পাঁচটার দিকে । তিন ঘণ্টা ক্লাস করতে করতে বিরক্তি লাগছে মিহি আর রুহি কে । এতক্ষণ বসে থাকতে থাকতে খিল ধরে গেছে কোমরে । বাড়ির গাড়ি অপেক্ষা করছে অফিসের সামনে । সেটাই এখন পৌঁছে দেবে ওদের । বাইরে বেরিয়েই রুহি মিহি কে জিজ্ঞেস করে...
" আজ বেশি কথা বলছিস না কেনো বলতো ?
কি হয়েছে ?
" কোই, কিছু না তো !
" ভাইয়ার শরীর কেমন আছে কাল থেকে একবারও জানতে চাইলি না যে ? জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হয় নি ? টেনশন হয় নি ভাইয়া কে নিয়ে ?
মিহি স্বাভাবিক ভাবেই বললো...
" তোর ভাইয়া ভালোই আছে নিশ্চয়ই ! আর তোর ভাইয়ার খবর নেওয়ার আমি কে ? অচেনা অজানা একটা মেয়ে আমি , আমাকে কেউ মনে রাখে যে আমি কাউকে মনে রাখবো ?
রুহি ভ্রু কুঁচকায় মিহির কথা শুনে । মিহির কন্ঠে স্পষ্ট রোষাবেশ প্রকাশ পাচ্ছে । রুহি ভারী গলায় প্রশ্ন করে...
" তুই আবার অচেনা অজানা হলি কবে থেকে , আর তোকে আবার কে মনে রাখলো না শুনি ?
" অচেনা অজানা আমি শুরু থেকেই । কে হোই আমি তোদের । তোরা চিনিস আমায় যে মনে রাখবি ।
মিহির ঘোর প্যাঁচ কথায় রুহি ভ্রু যুগল কুঁচকালো নাকের ডগা বরাবর । পর মুহুর্তে শান্ত স্বরে বলল..
" কি হয়েছে ভাবি জান ? ভাইয়া কিছু বলেছে তোকে ?
মিহি বিরক্তি প্রকাশ করলো । খিটখিটে তপ্ত স্বরে বলল...
" খবরদার ভাবি জান বলবি না আমায় । কে হোই আমি তোর ভাইয়ের ? একটা অচেনা অজানা মেয়েকে কেনো তোর ভাইয়া কিছু বলতে যাবে ?
" উফফফ.. তখন থেকে কি বারবার এক কথা বলে যাচ্ছিস বল তো ? তুই অচেনা অজানা হতে যাবি কেনো ? তুই তো আমার ভাবি জান, আর আমার ভাইয়ার জান !
" কে কার জান শুনি ?
পুরুষালি পরিচিত ভরাট কন্ঠে মিহি রুহি সহসা সামনে তাকায় । রাফি এসে দাঁড়িয়েছে ওদের সামনে । মুখে হালকা হাসি । মিহি চোখ সরিয়ে নেয় মুহূর্তের মধ্যেই । চোখ মুখ আরো বেশি শক্ত করে ফেলে । মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে,আজ ও কিছুতেই তাকাবে না এই লোকটার দিকে, কথা বলা তো দুরের কথা ।
ভাইয়া কে দেখে রুহি আপ্লুত হয়ে বলে...
" ভাইয়া, তুমি এসেছো ? কিন্তু তুমি আসতে গেলে কেনো ? তোমার রেস্টের প্রয়োজন এখন ? আম্মু আসতে দিলো তোমায় ?
রাফি মুচকি হেসে বললো...
" এমনি আসলাম । অফিসে একটা কাজ ছিল । আর তোদেরকেও দেখতে আসলাম !
" ওও...
তা আমা..দের দেখতে আসলে ?
খানিক মেকি স্বরে দুষ্টু হেসে কথাটা বলে রুহি । রাফি চোখ সরু করে তাকায় ওর দিকে । রুহি তৎক্ষণাৎ নিজের দু'ঠোটের মাঝখানে আঙুল চেপে মুখ বন্ধ করে নেয় । রাফি এবার গভীর দৃষ্টিতে তাকায় মিহির দিকে । মিহি দুহাত বুকে গুটিয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছে । অভিমান হয়েছে মেয়ের । কপাল ও থুতনিতে ভাঁজ পড়ে আছে । মিহির অভিমানী আদল রাফির মনে স্নিগ্ধতা ছড়িয়ে দিচ্ছে । নিঃশব্দে হাসে রাফি ।
আচমকা ফোন টা বেজে ওঠে ওর । ফোনের শব্দে মিহি বাঁকা চোখে তাকায় রাফির দিকে । চোখ মুখে কোন পরিবর্তন আনলো না তবুও ।
রাফি ফোন রিসিভ করে । ওপাশ থেকে কিছু একটা বলতেই রাফি গম্ভীর স্বরে বলে...
" সরি, রং নাম্বার । আমি চিনি না আপনাকে ! আর বারবার এভাবে ফোন করে ডিস্টার্ব করবেন না আমায় । আমি অচেনা অজানা কোন মেয়ে বা কারোর সাথেই কথা বলি না ।
বলেই ফোন কেটে আবারো ফোন পকেটে রাখে রাফি । রাফির কথা গুলো কানে পৌঁছাতেই মিহি ঠোঁটের এক কোণা কামড়ে সোজাসুজি তাকায় ওর দিকে । রাফিও মিহির দিকে চোখ ফিরায় একই সময় । চোখাচোখি হয় দুজনের । রুহি ঠোঁট থেকে হাত সরিয়ে লম্বা শ্বাস ছেড়ে বলল...
" বাবা...
কি হয়েছে আজ তোমাদের বলতো ? একজন নাকি অচেনা অজানা মেয়ে, আর একজন কে নাকি অচেনা অজানা মেয়ে ডিস্টার্ব করছে ?
তোমাদের ব্যপার-স্যাপার কিন্তু ডাউট লাগছে আমার কাছে !
রাফি খানিক বিরক্তি সূচক কন্ঠে বলল...
" এই অচেনা অজানা মেয়েটা আবার কে ?
" কে আবার ? আমার এই ভা.. না মানে পাখি..! সে বলছে তাকে নাকি কেউ চেনেই না, মনেই রাখে না ওকে কেউ ।
মিহি শক্ত কন্ঠে বলল...
" চুপ করবি ? ভালো লাগছে না আমার ! আমি গেলাম !
" কোথায় যাবি ?
" বাড়িতে !
" একা ?
" নাহ, তোর দুলাভাই প্রাইভেট প্লেন বুক করেছে আমার জন্য ! সেটা আসছে ব্যান্ড পার্টি নিয়ে , সেটাতেই যাবো !
একটু মেকি রাগান্বিত স্বরে কথাটা বললো মিহি । রুহি অবাক হওয়ার ভান করে রাফির দিকে তাকিয়ে কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করল..
" ভাইয়া, প্লেন বুক করেছো তুমি ? কোই আমায় বললে না তো ?
মিহি এবার দাঁত চেপে চিমটি কাটল রুহি কে । সহসা 'আউচচ' বলে মৃদু চেঁচিয়ে উঠলো রুহি । মিহি রাগান্বিত দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো রুহির দিকে । তা দেখে ফ্যাল ফ্যাল করে বোকার মত হাসলো রুহি ।
রাফি দুজনের কান্ড দেখে হাসি আটকে বললো...
" প্রাইভেট প্লেন না , তবে প্রাইভেট কার আছে । চলুন, পৌঁছে দেই আপনাদের !
মিহি মুখ ফিরিয়ে শান্ত স্বরে বলল...
" কোন প্রয়োজন নেই , একটা রিকশা ডেকে দিন । আমি যেতে পারবো !
" তা কি করে হয় ? আপনাকে একা ছাড়তে পারি কি করে ? আফটার অল আপনি আমার বোনের বেস্ট ফ্রেন্ড বলে কথা , অচেনা অজানা কোন মেয়ে হলে সেটা আলাদা ব্যাপার হতো ।
মিহি এবার রাফির দিকে তাকিয়ে দ্বিধা হীন ভাবে আঙুল তুলে বললো...
" বার বার এক কথা বলবেন না বলে দিলাম ! কাল থেকে আমার মাথায় চড়ে আছে এই কথাটা ।
রুহি সুযোগ বুঝে ওদের পাশ কাটিয়ে পা টিপে টিপে গাড়িতে এসে বসে । রাফি শান্ত নরম চোখে চেয়ে মৃদু হাসে । একই দৃষ্টিতে চেয়ে মোলায়েম স্বরে বলে...
" সরি , আর বলবো না । চলুন...
মিহিও কথা বাড়ালো না আর । বড় বড় পা ফেলে উঠে পড়লো গাড়িতে ।
মিহি দের বাড়ির সামনে এসে ওকে নামিয়ে দেওয়া হয় । এতক্ষণে একটু হাসি ফুটলো মিহির ঠোঁটে । গাড়ি থেকে নেমে এক চিলতে হেসে রুহির উদ্দেশ্য বললো...
" আসি পাখি..!
সাবধানে যাস ! আর বাড়িতে পৌঁছে আমাকে ফোন করবি কিন্তু !
রুহি নাক সিটকে মুখ বাঁকিয়ে বললো...
" আমাকে বলছিস কেনো ? ভাইয়ার মাথা থেকে বের হয়ে ভাইয়া কে বল, ভাইয়া যদি সাবধানে চালায় তবেই সাবধানে যেতে পারবো আমি ।
মিহি এক পলক তাকালো রাফির দিকে । চোখ ফিরিয়ে বিদ্রুপ করে বললো...
" তোর ভাইয়া অচেনা অজানা মেয়েদের সাথে কথা বলে না ।
বলেই এক সেকেন্ড অপেক্ষা না করে দ্রুত ঢুকে পড়লো বাড়ির ভিতর । রুহি লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলল । কিছু তো একটা হয়েছে এদের মাঝে । এদিকে রাফির হাসি পাচ্ছে ভীষণ । হাসতেও পারছে না । ঠোঁট চেপে আটকে রেখেছে হাসি । এদিকে মনের মাঝে ডানা ঝাপটে পাখি উড়ছে ওর । মিহি অভিমান করেছে, আর মানুষ তার উপরই অভিমান করে যাকে সে ভালোবাসে । ভালোবাসার মানুষ ব্যতীত অন্য কারোর উপর অভিমান ব্যাপার টা আসে না । আসলেও সেটাকে ঠিক অভিমান বলে না । অভিমানের তকমা টা আলাদা । যেটা সবার উপর আসে না ।
#চলবে........
4 days ago | [YT] | 23
View 5 replies
ঔপন্যাসিকা.কম
#এক_দেখায়
#পর্ব_২৭.......(২)
#সুরভী_আক্তার
রাফি নরম দৃষ্টিতে চেয়ে মনযোগ সহকারে শান্তর কথা শুনলো । শান্তকে ও ভালো করেই চেনে । রুহি ওর জেদ , থেকে অবসেশন , ভালোবাসা সব পর্যায়ে ছিল সেই আঠারো বছর আগ থেকে ।
আজ থেকে আঠারো বছর আগে যখন রুহির জন্ম হয়েছিল তখন শান্ত আর রাফির বয়স ছিল হবে দশ বছর । নরমাল ডেলিভারির মাধ্যমে হসপিটালেই জন্ম হয়েছিল রুহির । জন্মের পর সবসময় প্যাঁচ প্যাঁচ করে নাকে কান্না কাঁদতো রুহি । শান্ত আর রাফি কখনোই কাছে যেতো না ওর । দুর থেকে অবাক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকতো ওর দিকে । কি সুন্দর মোমের পুতুলের মত একটা বাচ্চা ছিল রুহি । গায়ের রং টুকটুকে ছিলো, টোকা দিলেই যেন রক্ত গড়িয়ে পড়বে ।
হসপিটাল থেকে তিন দিন পর বাড়িতে নিয়ে আসা হয়েছিল ওদের । চৌধুরী বাড়িতে দ্বিতীয় কোনো কন্যা সন্তান হওয়ায় পুরো ধুম পড়ে গেছিলো বাড়িতে । রাবেয়া চৌধুরীর গর্ভে মিফতাহুল ছিল তখন । শারীরিক অসুস্থতায় তিনি অতটা ঘর থেকে বের হতে পারতেন না । কোলেও নিতে পারতেন না রুহি কে । জুবায়ের চৌধুরীর ও বিয়ে হয় নি তখন । রুহির দেখাশোনার জন্য অনেককেই রাখা হয়েছিল সেই সময় । কিন্তু রুহি কারোর কোলেই থাকতো না । সবসময় প্যাঁচ প্যাঁচ করে কাঁদতো । আফসানা বেগম আর হেনা বেগম ব্যতীত ওকে কেউ সামলাতে পারতো না । হেনা বেগমের থেকে আফসানা বেগমের কোলে অধিক সময় থাকতো রুহি । শান্তর এতে বেশ হিংসে হতো । ওর আম্মু কিনা ওকে ছেড়ে এই ছিঁচকাদুনে মেয়েটাকে কোলে নিয়ে থাকে সবসময় । আদরও করে অনেক । শান্ত কটমট করে জ্বলতো হিংসায় । রুহির কাছে আসতো না কখনো ।
রাফিও বোনকে দুর থেকে দেখতো সবসময় । কাছে আসলেও ভয়ে ছুঁয়ে দেখতো না । যদি ব্যাথা পায় বা কেঁদে দেয়, এই ভয়ে কাছেও আসতো না রাফি । রাফির সাথে সবসময় যুক্ত থাকতো শান্ত । চোখ পাকিয়ে কটমট করে তাকাতো রুহির দিকে । রুহির উপর খুব ভীষণ রাগ হতো ওর ।
রুহির জন্মের এক সপ্তাহ পর ওকে ঘরে ঘুম পাড়িয়ে বাইরে এসেছিলেন হেনা বেগম । আফসানা বেগম বা অন্য কেউ ও আশেপাশে ছিল না । রাফি আর শান্ত খেলছিল ঘরের মেঝেতে । দোলনায় শোয়ানো ছিল রুহি । হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কেঁদে ওঠে ও । রাফি আর শান্ত একসাথে ভড়কে যায় । দু'জনে কোন কিছু না ভেবে প্রথম বারের মত ছুটে যায় ওর কাছে । হাত পা নাচিয়ে নাচিয়ে কাঁদছে রুহি । রাফি শান্ত কে ওর কাছে রেখে ছুটে যায় আম্মু কে ডাকতে । শান্ত সেই প্রথম বার ভালো করে দেখেছিল রুহিকে । বরাবরের মতো রুহির কান্না অসহ্য লাগে নি । বরং রুহির কান্না মাখা ছোট্ট পাখির ছানার মতো বাচ্চা মুখটা দেখে মায়া লেগেছিল ওর । শান্ত একটু ঝুঁকে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে কান্না থামানোর চেষ্টা করে । আচমকা ছোট্ট ছোট্ট নখের কবলে পড়ে শান্তর চুল । রুহি কাঁদতে কাঁদতে ঠিকড়ে উঠে খামচে ধরে শান্তর চুল । কোন রকমে চুল ছাড়ালেও আবার শান্তর ছোট হাতে আঁচড় পড়ে রুহির নখের ।
শান্তর নরম হাতে বেশ শক্ত করেই খামচে ধরেছিল রুহি ।
পরমুহূর্তে হেনা বেগম এসে সামলেছেন ওকে । হাতে খামচি দেওয়ায় শান্ত আরো বেশি রেগে যায় রুহির উপর । রাগে ফোঁস ফোঁস করতে করতে রাফির কাছে এসে নালিশ করে...
" দেখ, তোর ছিঁচকাদুনে বোন কি করেছে আমার হাতে । কত শক্তি দেখেছিস ওর । দাগ বসিয়ে ফেলেছে পুরো আমার হাতে । ব্যাবি বলে কিছু বললাম না, কিন্তু ও শুধু একবার বড় হোক আমি কিন্তু এর রিভেঞ্জ নিয়েই ছাড়বো বলে দিলাম ।
রাফি তখন তীক্ষ্ণ স্বরে জবাব দিয়েছিল...
" খবরদার আমার বোন কে কিচ্ছু করতে পারবি না । ও আমার বোন , ওকে কিছু করলে তোকে ছাড়বো না আমি ।
শান্ত বাচ্চা সুলভ হৃদয়ে একটু রেগে জেদ খাটিয়ে বলেছিল...
'' ও তোর বোন , কিন্তু দেখিস ওকে আমি বড় হয়ে বিয়ে করবো । তখন আমি আমার এই প্রতিশোধ নিয়ে নেবো । তখন কিচ্ছু করতে পারবি না তুই । ওকে বিয়ের পর আমিও চিমটি কাটবো ।
★
পুরনো স্মৃতি চারণ করে রাফি আর শান্ত দু'জনেই মৃদু হেসে ওঠে । সেই একটা চিমটির প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য রুহির পিছনে পড়েছিল শান্ত । সবসময় খোঁচাতো রুহিকে । কিন্তু গায়ে হাত দিতো না কখনো । ধীরে ধীরে বড় হওয়ায় সাথে সাথে অনুভূতিরা পরিবর্তন হয় । একটা জেদ পরিনত হয় ভালো লাগায় । আর সেটা একসময় ভালোবাসায় ।
শান্ত জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে কোমল স্বরে বলে....
" তোর বোনের উপর সেই চিমটির প্রতিশোধ নেওয়া এখনো বাকি । আমি কিন্তু কিছু ভুলি নি । একবার খালি বিয়েটা হতে দে , সত্যি বলছি আমি কিন্তু প্রতিশোধ নিয়েই ছাড়বো । ছাড় পাবে না তোর বোন । হাজার গুণ বাড়িয়ে প্রতিশোধ নেবো আমি ।
রাফি এবার গলা খাঁকারি দিয়ে শুকনো কেশে ওঠে । গলা পরিষ্কার করে বলে...
" হয়েছে , আমার সামনে এসব বলতে হবে না । ভাইয়া হোই আমি ওর । আগেও ছিলাম, আর এখনো আছি ।
এখন যা দেখি, আমার টায়ার্ড লাগছে ভীষণ । তুইও রেস্ট নে একটু ।
শান্ত উঠতে উঠতে বলল...
" তুই রেস্ট কর । আমি একটু আম্মুর কাছ থেকে আসছি ।
বলেই ঘর থেকে বেরিয়ে আসে শান্ত ।
আফসানা বেগম ঘরে আধশোয়া হয়ে শুয়ে আছেন । রুহিও আছে তার সাথে । জেনি ঘুমিয়েছে । তাই কারোর সঙ্গ না পেয়ে রুহি এখন এসেছে আফসানা বেগমের কাছে । টুকটাক গল্প হচ্ছে দুজনের মাঝে ।
শান্ত বাইরে থেকে কড়া নাড়ে দরজায় । আফসানা বেগম মাথা তুলে তাকান । শান্ত ঘরে ঢুকতেই রুহি জড়োসড়ো হয়ে বসে । মুচকি হাসে একটু । শান্ত রুহির চোখে চোখ রেখে রুহির হাসিতে নিজেও হেসে ওঠে নীরবে । অসময়ে ছেলে কে দেখে অবাক হন আফসানা বেগম । তিনি প্রশ্ন সূচক নয়নে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করেন...
" কি হয়েছে বাবা ? রাফি ঠিক আছে ?
শান্ত এগোতে এগোতে জবাব দেয় ..
" হুম আম্মু..!
" তাহলে তুই এখানে, ক্লান্ত দেখাচ্ছে তোকে ! খেয়েছিস কিছু ? একটু বিশ্রামের প্রয়োজন তোর ।
শান্ত কিছু না বলে খাটে শুয়ে আচমকা আম্মুর কোলে মাথা রাখে । চোখ বন্ধ করে শ্বাস টেনে আবদারের সুরে বলে...
" মাথা টা ভীষণ যন্ত্রণা করছে আম্মু । ভালো লাগছে না কিছু । মাথায় একটু আগের মতো হাত বুলিয়ে দেবে ? কতদিন এভাবে হাত বুলিয়ে দাও নি বলতো ?
আফসানা বেগম হাঁ বনে যান ছেলের কথায় । ঠিক কত দিন পর শান্ত এভাবে কোলে মাথা রাখলো তার । বাচ্চা সুলভ ঠিক আগের মতো আবদার করলো ! এখন তো বড় হয়েছে ছেলে । এসবের জন্য আলাদা করে সময় পায় না আর । ব্যস্ততায় থাকে সবসময় ।
ছেলের ক্লান্ত মুখ পানে তাকিয়ে চোখ ভরে ওঠে আফসানা বেগমের । তিনি তড়িতে স্নেহ মাখা হাত বুলিয়ে দিতে থাকেন ছেলের মাথায় । রুহিও অবাক হয় খানিক ।
মা ছেলেকে আলাদা সময় করে দিয়ে খাট থেকে নেমে আসতে চায় বেরিয়ে আসার জন্য । রুহি খাট থেকে নামার আগেই শান্ত মোলায়েম কন্ঠে ডাকে...
4 days ago | [YT] | 25
View 1 reply
ঔপন্যাসিকা.কম
#এক_দেখায়
#পর্ব_২৭
#সুরভী_আক্তার
এদিকে হসপিটাল থেকে ফিরতেই রাফি কে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে সবাই । চৌধুরী বাড়ির একমাত্র ছেলে সবার নয়নের মণি অসুস্থ, ব্যস্ত হওয়ারই কথা ।
রাফি নিজের ঘরে খাটের ব্যাক বোর্ডে হেলান দিয়ে বসে আছে । ঠোঁটে হাসি ঝুলিয়ে মাথা এলিয়ে কোমল নেত্রে দেখে যাচ্ছে হেনা বেগমের কান্ড । হেনা বেগম ট্রে ভর্তি ফলমূল কেটে সাজিয়ে এনেছেন ছেলের জন্য । হসপিটাল থেকে ফেরার পর পরই ভেজা কাপড়ে ছেলের গাঁ মুছিয়ে দিয়েছেন তিনি । রাফি একদম ফিট আছে । তবুও হেনা বেগম খাট থেকে নামতে দেন নি ছেলেকে । ডাক্তার আপাতত ঝাল খাবার খেতে বারন করেছে রাফি কে , এলার্জি তে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে এতেও । হেনা বেগম এটা শুনেই ঝাল বিহীন রান্না করেছেন আজকে । আজ সবার ঝাল খাওয়া বন্ধ । ছেলের জন্য কাঁদতে কাঁদতে চোখ মুখ ফুলিয়ে ফেলেছেন তিনি ।
অ্যানাফাইলাক্সিস অত্যন্ত মারাত্মক । রাফির প্রাণের ঝুঁকি থাকতে পারতো এতে । ছোট বেলা থেকে রাফি কে সবসময় এলার্জি জনিত খাবার থেকে বিরত রেখেছেন তিনি ।
এখন তো ছেলে বড় হয়েছে । আগের মতো তো আর সবসময় চোখে চোখে রাখা যায় না । নিজের একান্ত জীবন হয়েছে তার । তবুও ছেলে কে নিয়ে সবসময় চিন্তায় থাকেন তিনি ।
রাফির সামনে বসে রাফি কে নিজের হাতে ফল খাইয়ে দিচ্ছেন তিনি । রাফিও বাধ্য ছেলের মত নিঃশব্দে খেয়ে যাচ্ছে মায়ের হাতে । এতক্ষণ রাফির ঘরে সবাই ছিল । এখন ওকে একটু রেস্ট করার জন্য সময় দিয়ে বেরিয়ে গেছে সবাই । শান্ত ঘরে ঢুকতে গিয়ে থমকে দাঁড়ালো দরজায় । মা ছেলের সুন্দর একটা মুহূর্ত দেখে বুকে হাত গুটিয়ে দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়ালো ও । মুচকি হাসলো একটু । আফসানা বেগমও তো শান্ত কে কম ভালোবাসে না ! কিন্তু শান্ত ? সে তো সময়ই দিতে পারে না আম্মু কে ! এড়িয়ে চলে সবসময় । একমাত্র ছেলে হওয়ার দরুন শান্ত কে কখনো চোখের আড়াল করতে চান না আফসানা বেগম । কিন্তু শান্ত , অধিক সময় চোখের আড়াল থাকে মায়ের । অনেক দিন হলো সময় করে একটু জড়িয়ে ধরা হয় না আম্মু কে । ঠিক মতো কথাও বলা হয় না । শান্ত হাসলো কিছু একটা ভেবে । আফসানা বেগমও এসেছেন রাফির অসুস্থতার কথা শুনে । এখন নিজ ঘরে আরাম করছেন তিনি । শান্ত কিছু একটা ভেবে পিছন ফিরলো আম্মুর কাছে যাওয়ার জন্য । দরজার চৌকাঠ পেরোনোর আগেই হেনা বেগমের কান্না ভেজা কন্ঠ কানে আসলো...
" দেখ রাফি ,, বড় হয়েছিস তুই ! তোকে নিয়ে সবসময় এমন টেনশন করতে আর ভালো লাগে না আমার । তুই কি নিজের ঠিকমতো খেয়াল টুকুও রাখতে পারিস না ? তুই তো জানিস তোর এলার্জি আছে , তাহলে এসব এলার্জি জনিত খাবার খাস কেনো তুই ?
রুহি বলল.. ওদের সাথে নাকি ফুচকা খেয়েছিলি , কি ছিল ফুচকায়, হঠাৎ এমন কেনো হলো তোর ?
রাফি আম্মুর হাত ধরলো । মোলায়েম কন্ঠে বললো...
" আম্মু, এসব বাদ দাও তো । এখন তো আমি ঠিক আছি । আর কি চাই তোমার ?
" এখন ঠিক আছিস, কিন্তু কাল ? কাল ঠিক ছিলি তুই ? অক্সিজেন নির্ভর ছিলি সারা রাত । একদিনেই কেমন শুকিয়ে গেছিস ! শরীর টা কেমন ফ্যাকাশে হয়ে আছে ।
কথা দে আমায়, আর কখনো এসব হাবিজাবি খাবার খাবি না তুই !
" আচ্ছা আম্মু , ঠিক আছে আর কখনো ওসব খাবো না আমি । তুমি এখন আর অতো টেনশন করো না তো , কাল সারারাত ঘুমাও নি, এখন গিয়ে একটু রেস্ট করো ।
দুজনের কথার মাঝেই শান্ত বাইরে না বেরিয়ে ঘরে ঢুকলো । শান্ত কে দেখে হেনা বেগম উঠে দাঁড়ালেন । গাঁ ম্যাজ ম্যাজ করছে তার । নিজেরও বিশ্রামের প্রয়োজন । শান্ত এসে দাঁড়ালো খাটের পাশে । হেনা বেগম শান্ত কে উদ্দেশ্য করে বললেন...
" শান্ত, বাবা তুই ও তো কাল থেকে অনেক ধকল সামলেছিস । তোরও বিশ্রামের প্রয়োজন । রাফির সাথে তুইও রেস্ট কর একটু , আমি আসছি ।
বলেই ধীর পায়ে ঘর ত্যাগ করলেন হেনা বেগম । তিনি চলে যেতেই শান্ত ঠোঁট কামড়ে কপাল কুঁচকে তাকালো রাফির দিকে । রাফি আম্মুর যাওয়ার দিক থেকে চোখ সরিয়ে শান্তর পানে তাকালো । শান্তর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দেখে ভ্রু কুঁচকে আসলো রাফির । স্বাভাবিক কন্ঠে বলল....
" কি দেখছিস এভাবে ?
শান্ত সিরিয়াস ভঙ্গিতে দ্বিগুণ ভারী গলায় শুধালো...
" কাল হঠাৎ অ্যানাফাইলাক্সিস আক্রমণ করলো কিভাবে ? কি খেয়েছিলি ?
রাফি গাঁ ছাড়া ভাব নিয়ে জবাব দিলো...
" খেয়েছিলাম কিছু একটা !
" চকলেট খেয়েছিলি ? কোথায় পেলি চকলেট ?
" পেয়েছি কোথাও...
" মিহি খাইয়েছে তাই না ?
" জানিস যখন, তখন জিজ্ঞেস করছিস কেনো ?
শান্ত তপ্ত শ্বাস ফেললো । বসলো রাফির পাশে । নরম কন্ঠে গলা নামিয়ে বললো...
" পাগল হয়ে গেছিস তুই ? তোর প্রাণ সংশয়ে
ছিল । যদি কিছু হয়ে যেতো ? সবটা জেনেও কেনো এমনটা করলি তুই ? ওকে বলতে পারতি, ও তো জানতো না বল । বেচারি জানার পর কতটা কষ্ট পেয়েছে ভাবতো । রুহির সাথে কথা হওয়ার পনেরো মিনিটের মাথায় ছুটে এসেছে ও । তাহলে ভাব , ওর কি অবস্থা হয়েছিল ।
রাফি আলতো হাসলো । বুকের বাম পাশে হাত রেখে চোখ বন্ধ করে মাথা এলিয়ে দিলো ব্যাক বোর্ডে । লম্বা শ্বাস টেনে হাস্কি স্বরে বলল...
" সত্যি পাগল হয়ে গেছি রে আমি ! বিশ্বাস কর আর পারছি না আমি । ও পাগল করে দিচ্ছে আমায় । আমি তো এমনটা ছিলাম না , কবে এমন হলাম ?
ওর চোখের স্বাভাবিক চাহনিও পুড়িয়ে ফেলে আমাকে , ছিন্ন ভিন্ন করে দেয় আমার হৃৎপিণ্ড কে । ওর হাসি সবসময় ঝংকার তোলে আমার কানে । আমি হারিয়ে যাচ্ছি । দিক দিশা হারিয়ে যায় আমার ওর সামনে গেলে । কিচ্ছু ভাবতে পারি না আমি । নিজের কথা ভাববো কি করে ?
জানিস, আমি যেমন এক দেখায় ওর মায়ায় জড়িয়ে গেছি, ও নিজেও একটু একটু করে জড়িয়ে যাচ্ছে আমাতে । শত চেষ্টা করলেও আর নিজেকে ছাড়াতে পারবে না আমার কাছ থেকে ।
শান্ত ঠোঁট কামড়ে হাসলো রাফির কথায় । রাফির অনুভূতি গুলো বুঝতে পারছে ও । ও নিজেও তো একসময় এই পর্যায়ে ছিল । না বোঝার কথা নয় ।
শান্ত এবার ঠোঁট চেপে রসিকতার সুরে টিটকারী মেরে বললো...
" তোকে দেখে একটা গান মনে পড়ে গেলো । বলি তাহলে ? জানি তোর মতো গলায় সুর নেই আমার , গলাটা ফাটা বাঁশের মতো হতে পারে । কিন্তু তবুও তোর অবস্থা দেখে আটকাতে পারছি না নিজেকে , বলি শোন...
উহুম উহুম......
Oo darling tu pehle SE Kitna
badal geya..
Strang Liye Jadu tera
'Mihi Pakhi' pe chal geya....
শান্ত হাত নেড়ে নেড়ে গাইলো দুলাইন । শান্তর বেসুরো গান আর তার অর্থ বুঝে হেসে উঠলো রাফি । শান্ত নিজেও তাল মিলিয়ে হাসলো । রাফি কে হাসতে দেখতে ভীষণ ভালো লাগে ওর । রাফি হাসতে হাসতে থেমে জোরে শ্বাস টানলো । নিগুড় চোখে চাইলো সিলিংয়ের দিকে ।
শান্ত বললো...
" তাহলে , অপেক্ষার প্রহর কবে শেষ হচ্ছে ? মিহি পাখি অনুভূতি থেকে বেরিয়ে বাস্তবে ধরা দিচ্ছে কবে ?
রাফি একই আবেশিত কন্ঠে উত্তর করলো...
" খুব তাড়াতাড়ি,, ইনশাআল্লাহ । আমার প্রতি ওর অনুভূতি গুলো আরো একটু গাঢ় হতে দে । ও চাওয়া অনুযায়ী আমিও চাই ও আমার চোখে ওর প্রতি আমার অনুভূতি, আকাঙ্ক্ষা ভালোবাসা সবটা বুঝুক । সবটা বোঝার পর ও যতদিন না আমার কাছে নিজে থেকেই ধরা দেবে ততদিন অপেক্ষায় থাকবো আমি ।
" উফফফ, যা করবি তাড়াতাড়ি কর ভাই । আমারো তো বিয়ে করতে ইচ্ছে করে নাকি ? তোর পর তোর বোন, আর তোর বোনের মানেই আমার বিয়ে ।
" আমার বোনের সাথে যদি কেউ তোর বিয়ে না দেয় তাহলে ?
" হুহহ..
কে দেবে না শুনি ? তোর বাপ ? শোন তোর বাপ যদি বেশি তেড়ামো করে না, তাহলে সাফ সাফ বলে দেবো.. ' শুনুন চৌধুরী সাহেব, হয় আপনার মেয়ে কে আমার হাতে তুলে দিন , আর নয়তো আমি নিজেই তুলে নিয়ে আসবো ওকে । কেউ আটকাতে পারবে না আমায় ।
রাফি আবারো হেসে ফেললো । শান্ত তপ্ত শ্বাস ফেলে শুয়ে পড়লো, একটু অসার কন্ঠে বলল..
" শোন ভাই তোর বোন শুধুই আমার । ও যতদিন এই বাড়িতে আছে, ততদিন ওকে শুধু আমার জন্য সেফ করে রাখিস প্লিজ । তার পর ওর দায়িত্ব আমার । ওকে নিয়ে তোদের আর কখনো, কোনো দিন ভাবতে হবে না । শুধু ওকে আমার জন্য লিখে দে একবার ।
ভেবে দেখ তুই এই একটা বছরেই মিহি পাখি কে ঠিক কতটা ভালোবেসেছিস , তাহলে আমি ? আমি গত আঠারো বছর ধরে তোর বোনকে চেয়ে এসেছি । রাগের মাথায় ওকে জেদ হিসেবে চেয়েছিলাম আমার জীবনে । কিন্তু এই জেদ যে কবে ভালোলাগা থেকে ভালোবাসায় পরিনত হয়েছে বুঝতেই পারিনি ।
তোর বোন রক্তের সাথে মিশে গেছে আমার ।
4 days ago | [YT] | 16
View 3 replies
ঔপন্যাসিকা.কম
#সুখের_নেশায়
#লেখিকাঃআসরিফা_সুলতানা_জেবা
#পর্ব___১০.......(২)
' আপনি তো আমার খবর নেন নি। তাই আমি চলে এলাম আপনাকে দেখতে। নির্মলিত চক্ষুদ্বয়ে যদি আপনার প্রতিচ্ছবি ভাসে, তাহলে স্বচক্ষে, বাস্তবে কেন একটা বার আপনাকে দেখার জন্য ছুটে আসতে পারব না চৈত্র?'
সাফারাতের স্বাভাবিক বাক্য অস্বাভাবিক ভাবে চৈত্রিকার মস্তিষ্ককে গিয়ে বিধঁল। আমতা আমতা করে বললো,
' মানে?'
' অদ্ভুত হলেও সত্যি আপনি আমার স্বপ্নে এসেছিলেন। তাই ভাবলাম অসুস্থ শরীর নিয়ে বিছানায় পড়ে না থেকে একটা বার দেখে আসি আপনাকে। এবার চলুন।'
গলায় গম্ভীরতা এঁটে বললো সাফারাত। চৈত্রিকা চুপ করে শুনে গেল। সে ক্ষণিকের জন্য অন্য কিছু ভেবে বসেছিল। অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে ক্ষীণ নিঃশ্বাস ফেলল। যথাসাধ্য চেষ্টা করল নিজের মুখ ভঙ্গি সাফারাতের কাছ থেকে লুকাতে। আমরা যাকে ভালোবাসি সেই মানুষটাও আমাদের ভালোবাসুক এটাই তো প্রত্যাশা করি। চৈত্রিকা এক মুহুর্তের জন্য ধরে নিয়েছিল মিমের কথা সত্যি। সাফারাতের মনে হয়ত তার জন্য অনুভূতি আছে। কিন্তু পরক্ষণেই সে ভুল প্রমাণিত হলো।
' ওইদিকে তাকিয়ে আছেন কেন?যাবেন না?'
' কোথায়?'
' আমাকে বেশি প্রশ্ন করলে বিরক্তি ধরে যায় চৈত্র। বিশ্বাস রেখে চলতে পারেন। নাকি আগের মতো বিশ্বাস নেই? '
সাফারাতের কন্ঠে স্পষ্ট বিরক্তির ছোঁয়া। চৈত্রিকা উত্তেজিত সুরে বললো,
' কেন থাকবে না?সময় পেরিয়ে গেলেও বিশ্বাস ঠুনকো হয় না। যদি অপর মানুষ টা বিশ্বাস রাখতে জানে।'
কথাটা বলে চৈত্রিকা হাঁটতে শুরু করে সোজা। আবছা আঁধারে একটা রিকশা দেখা যাচ্ছে। ওইদিকেই এগিয়ে গেল দু'জনে। রিকশাওয়ালা চাচা সাফারাত কে দেখে বিস্তর হাসল পান খাওয়া লাল লাল দাঁত গুলো দেখিয়ে। চৈত্রিকা বুঝল সাফারাত নিশ্চয়ই তাকে এখন রিকশায় উঠতে বলবে! তাই বলার পূর্বে উঠে বসল। চেপে গেল খানিকটা। সাফারাত পাশে বসে গা ঘেঁষে। এক রিকশায় দু'জন মানুষ, মাঝখানে থাকবে দূরত্ব তা ভাবা ভুল।
চাচা হুডি তুলে দিতে চাইলে বাঁধা দেয় সাফারাত। রিকশা চলার সাথে সাথে হুড় হুড় করে প্রবল হাওয়া ছুঁয়ে দিচ্ছে দেহের সর্বাঙ্গে। চৈত্রিকার জামা টা পাতলা হওয়ার দরুন নিদারুণ ভাবে কাঁপতে লাগল সমস্ত দেহ। জড়োসড়ো হয়ে বসল কিছুটা। হাত টা বার বার সাফারাতের লোমশ হাতে লেগে যাচ্ছে। নাসারন্ধ্রে গিয়ে ঠেকছে চিরচেনা পারফিউমের মৃদু মৃদু সুবাস। সাফারাত গম্ভীর স্বরে বলে উঠল,
' একটু নিচু হন তো চৈত্র। নাহলে আপনার মাথায় হাত লেগে যাবে।'
চৈত্রিকা বুঝল না। কিন্তু কথামতো মাথা ঝুকালো। সাফারাত নিজের গায়ের জ্যাকেট খুলে চৈত্রিকার পিঠে দিয়ে দিল। দুর্বল কন্ঠে বললো,
' এটা পড়ে নিন।'
' কিন্তু আপনি?'
' আমাকে আপনার মতো কাঁপতে দেখেছেন?শীত না আসতেই এতো কাঁপছেন। '
চৈত্রিকা কিঞ্চিৎ লজ্জা পেল। জ্যাকেট টা গায়ে জড়িয়ে নিয়ে আঁড়চোখে তাকাল সাফারাতের দিকে। চেয়ে রইল অনিমেষ। ভিতর থেকে রোমাঞ্চকর অনুভূতি জেগে উঠছে। নতুন করে প্রেমে পড়ছে চৈত্রিকা। নতুন ভাবে মনে আবারও ভালোবাসা বেড়ে চলেছে পাশে থাকা মানুষটার জন্য। চৈত্রিকার অবচেতন মন সাফারাতের দিকে ঝুঁকে পড়লেও সচেতন মস্তিষ্ক জানিয়ে দিল--' সাফারাত ভালোবাসে না তোকে চৈত্র। ভালোবেসে বন্ধুত্ব নষ্ট করিস না। তাছাড়া নিজেদের পরিস্থিতি দেখ। রাত পোহালে হয়ত রাস্তায় ঠাঁই হবে তাই সাফারাতের মতো ছেলেকে চাওয়া নিতান্তই বোকামি।'
সূক্ষ্ম নিঃশ্বাস ছেড়ে সামনে তাকাল। একটা টং দোকান দেখা যাচ্ছে। এই গভীর রাতেও মানুষ চায়ের সাথে আড্ডা জমিয়েছে জমপেশ। সাফারাত রিকশাওয়ালা কে বললো,
' চাচা এখান থেকে তিনটা চায়ের কাপ নিয়ে আসুন। একেবারে কিনে নিয়ে আসবেন। তাহলে আর ফেরত দিতে হবে না।'
এই বলে সাফারাত ওয়ালেট থেকে টাকা বের করে চাচার দিকে বাড়িয়ে দিল। রিকশাওয়ালা চলে গেল কাপ আনতে। চৈত্রিকার মুখ টা থমথম হয়ে গেছে অকস্মাৎ। তার উচিত ছিল সাথে তিনটা কাপ নিয়ে আসার। একবারও মাথায় আসে নি চা খাবে কিভাবে! কাপ নিয়ে আসতেই সাফারাত চা ঢেলে প্রথমে চাচাকে দেয়। চাচা মুখে হাসি ফুটিয়ে নিয়ে নিলেন। খুশি হলেন খুব,তা চেহারায় স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে চৈত্রিকা। আরেক কাপ চৈত্রিকার হাতে ধরিয়ে দিয়ে সাফারাত নিম্নস্বরে বললো,
' চাইলেই এখান থেকে চা খেতে পারতাম। কিন্তু আজ আপনার হাতের চা খেতে ইচ্ছে হয়েছিল চৈত্র। কষ্ট দিলাম একটুখানি। '
চৈত্রিকা যতই সাফারাতের কথা শুনছে তীব্র অবাক হচ্ছে। রিকশা আবারও চলছে। চৈত্রিকা চোখ ঘুরিয়ে চারপাশ টা দেখছে। গাঢ় তমসার ভিড়ে রিকশায় চড়ে শহর দেখবে তা কল্পনাতীত ছিল চৈত্রিকার। দৈনন্দিন জীবনের কঠিন পরিস্থিতি, কষ্ট, দুঃখ, ক্লান্ত এক নিমিষেই ভুল গেল চৈত্রিকা। ক্ষণিক সময়ের জন্য। ক্লান্ত আঁখিদ্বয় বুঁজতেই কর্নধার হলো সাফারাতের মাদকতাপূর্ণ কন্ঠস্বর,
' আপনি আমাকে দেখতে কেন গেলেন না চৈত্র?'
বিস্মিত হলো চৈত্রিকা। তৎক্ষনাৎ জিজ্ঞেস করল,
' কোথায় দেখতে যায় নি?'
' বহু বছর আগে যখন আমি জ্বরে কাতরাচ্ছিলাম তখন। আপনি খোঁজ নেন নি আমার। অভিমানে জার্মান পাড়ি জমিয়ে আমি বুঝতে পেরেছিলাম আপনাকে ছাড়া আমার কত কষ্ট হচ্ছিল। আম্মু কে অনেক বার বলেছি আমার কষ্ট হচ্ছে চৈত্র কে ছাড়া। আম্মু আমায় আশ্বাস দিয়েছিল আপনার খোঁজ করবে। আপনাকে দেখতে যাবে। নিজের কাছে যত্ন করে রাখবে আপনাকে যেন জার্মান থেকে ফিরেই আমি আপনাকে পেয়ে যাই। কিন্তু আম্মু রাখে নি নিজের দেওয়া কথা। চলে গেছে আমায় অমানুষগুলোর কাছে রেখে। '
এলোমেলো কন্ঠে অনেক কিছু বলতে লাগল সাফারাত। চৈত্রিকা হতবিহ্বল। সাফারাতের কথা বুঝে উঠতে পারছে না। সাফারাত কি কলেজ জীবনের কথা বলছে!
লাগাতার বিড়বিড় করে যাচ্ছে সাফারাত। চৈত্রিকা প্রথম কথাগুলো স্পষ্ট শুনলেও এখন আর শুনছে না। ভয়ার্ত নেত্রে সাফারাতের দিকে তাকাল। গায়ে স্পর্শ করতে বুকটা ধ্বক করে উঠে। কন্ঠে এক রাশ উৎকন্ঠা,
' চাচা উনার বাড়িতে নিয়ে চলুন। জ্বরে গা পুরে যাচ্ছে। '
' কোথাও নিবেন না চাচা। আপনি বলার কে চৈত্র?চাচা শুধু আমার কথা শুনবে।'
সাফারাতের ধমকে চৈত্রিকা করুন দৃষ্টিতে তাকাল। হয়ত জ্বরের ঘোরে ধমকেছে সাফারাত। নদীর ধারে রিকশা থামতেই সাফারাত দুর্বল দেহ টা নিয়ে নেমে পড়ল। চৈত্রিকা কে হাত ধরে নামিয়ে হাঁটতে শুরু করে। নিজে একটা বেঞ্চে বসে চৈত্রিকাকে বসতে ইশারা করল। চৈত্রিকা বসল,অনেকখানি দূরত্ব রেখে। মাঝখানে আরো দু'জন বসতে পারবে।
' আমার জ্বর কিন্তু আমায় কাবু করতে পারছে না চৈত্র। '
নিষ্প্রাণ স্বরে আওড়ালো সাফারাত। চৈত্রিকার মনে হচ্ছে সাফারাত শুরু থেকেই সম্পূর্ণ জ্বরের ঘোরে। আচ্ছা এতো সুন্দর মুহুর্ত গুলো কি ভুলে যাবে সাফারাত জ্বর সাড়লেই?হতাশাজনক নিঃশ্বাস ফেলে বিরস মুখে পাশের মানুষটার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করল। সঙ্গে সঙ্গে সাফারাত নিঃসংকোচ এক আবেদন করে বসে,
' আপনার মনে আছে চৈত্র আপনার বাবার একবার হার্ট এট্যাক হয়েছিল?সেদিন কলেজে আমাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে বাচ্চাদের মতো কেঁদেছিলেন আপনি। এখন কি বাবার জন্য কষ্ট হয় না আপনার?কষ্টগুলো উজাড় করে দিবেন আজ আরো একবার আমার বুকে?'
নিস্তব্ধতা চৈত্রিকাকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে নিয়েছে যেন। বিমূঢ় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সম্মুখে দাঁড়ানো সাফারাতের দিকে। হোক না জ্বরের ঘোরে তবুও সাফারাতের প্রশস্ত বুকে মাথা রেখে কাঁদার সুযোগ তো মিলেছে।সকল দ্বিধাদ্বন্দ্ব ভুলে হামলে পড়ে বুকে। নিঃশব্দে কাঁদে চৈত্রিকা। অজস্র কষ্ট অশ্রু রুপে ঢেলে দেয় সাফারাতের বুকে। ভিজিয়ে দেয় বুক আবৃত করে রাখা সাদা গেঞ্জি টা। কতকাল কষ্ট ভাগ করে দেওয়ার মানুষ পায় নি চৈত্রিকা!সাফারাত চৈত্রিকার পিঠে হাত রাখে। বক্ষে মাথা গুঁজে রাখা মেয়েটাকে শক্ত করে আবদ্ধ করে নিজের মাঝে।
____________________
জ্যাকেট দু'টো গুছিয়ে একটা ব্যাগে ভরে নিল চৈত্রিকা। ঘড়ির কাটা দশের ঘরে। নিজেকে কিছুটা পরিপাটি করে নিয়ে প্রস্তুত হলো জ্যাকেট গুলো সাফারাতের হাতে ফিরিয়ে দেবার জন্য। দুই দিন কেটে গেছে সেই রাতের পর। ঠিক কতক্ষণ সেদিন নদীর পাড়ে কেটেছিল তার হিসেব নেই চৈত্রিকার। শুধু এটুকুই খেয়াল আছে সাফারাত যখন তাকে নামিয়ে দিয়ে যায় গেইটের সামনে তখন ভোরের আলো সবে ফুটতে শুরু করেছে। কত সহজে একটা রাত পাড় করে দিল সাফারাতের পাশাপাশি বসে থেকে নীরবে,নিভৃতে! শীতল স্রোত নেমে গেল চৈত্রিকার শিরদাঁড়া বরাবর। ফেরার সময় জ্যাকেট টা ফিরিয়ে দিতে চাইলে সাফারাত কটাক্ষ করে বলে,
' একসাথে দু'টো ফিরত দিলেই হবে।'
কথাটা বলে দ্রুত প্রস্থান করে রিকশায় চড়ে। চৈত্রিকা ভেবেছিল জ্বরে হয়ত সাফারাত দুর্বল হয়ে পড়েছে। পরক্ষণেই সাফারাতের গম্ভীর স্বর,চলাচলে মনে হলো জ্বরও এই পুরুষকে কাবু করতে পারে নি।
রুমে কারো পদার্পণের শব্দে চৈত্রিকা ব্যাগ টা একপাশে রেখে দিল। মিমের চিন্তিত মুখাবয়ব দেখে কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
' কি হয়েছে মিমু?'
তাৎক্ষণিক মিমের কাছ থেকে জবাব এলো,
' বাবার বন্ধুর ছেলে তাহাফ ভাই আছেন না?উনি এবং উনার পুরো পরিবার তোমার জন্য বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসেছে আপু। বাবার সাথে কথা বলছেন। মা রাজি।'
#চলবে,,!
(ভুল-ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।)
4 days ago | [YT] | 24
View 2 replies
ঔপন্যাসিকা.কম
#সুখের_নেশায়
#লেখিকাঃআসরিফা_সুলতানা_জেবা
#পর্ব___১০
রাতের হিম শীতল পবনে চৈত্রিকার মাথায় চাপানো লাল পাতলা ওড়না টা সরে গেছে। এক গুচ্ছ কেশ বাতাসের আলিঙ্গনে মুক্ত হয়ে গেল। উড়তে শুরু করে অবাধে। চৈত্রিকাকে জ্বালাতনে মত্ত চুলগুলো। এক হাতে ফ্লাস্ক আঁকড়ে ধরে অন্য হাতে চুলগুলো ঠিক করে ওড়না টেনে মাথায় দিল চৈত্রিকা। ল্যাম্পপোস্টের আলোয় ঝলমল করছে চারপাশ। আকাশের চাঁদ আজ দীপ্ততা ছড়াচ্ছে না। চাঁদ বোধ হয় নত হয়েছে মেঘের কাছে। তাই তো এক ফালি কালো মেঘ উড়ে এসে ঢেকে দিয়েছে চন্দ্রিমা। চৈত্রিকা ধীর ধীর পা ফেলে সাফারাতের কাছে এল। ঠিক কাছে নয় মধ্যিখানে দূরত্ব এক হাত। অথবা তার চেয়ে অধিক। সাফারাতের কৃষ্ণচূড়ার ন্যায় রাঙা মুখশ্রীতে দৃষ্টি নিক্ষেপ করল চৈত্রিকা মাথা উঁচু করে। চৈত্রিকা যে খাটো এমন নয়,যথেষ্ট লম্বা সে। কিন্তু সাফারাত তার থেকে একটু বেশিই লম্বা। বয়সের ব্যবধান এক কি দু'মাস হবে অথচ সে কত চিকন। মনে হয় ফুঁ দিলেই উড়তে পারবে অনায়সে। উল্টো সাফারাতের সুঠাম,বলিষ্ঠ দেহ। হাত দুটো পেশিবহুল। বাহ্যিক গঠন প্রকাশ করে সাফারাত বোধ হয় চৈত্রিকা থেকে অনেক বড়। এমন তো কিছুই নয়। দু'জনেই তো সমবয়সী। চৈত্রিকা আগে বিনাবাধায় মন খুলে সবকিছু সাফারাতের কাছে ব্যক্ত করলেও আজ আর পারে না। সময় বদলে গেছে। পেরিয়ে গেছে বহু বছর। বছর খানেক পর সাফারাত কে খুঁজে পেল চৈত্রিকা এক নতুন সাফারাত হিসেবে। যার নিকটে একটা শব্দ বলতেও চৈত্রিকার বুকে একদফা তোলপাড় হয়ে যায়।
সাফারাত লাল চক্ষুজোড়া নিয়ে চৈত্রিকার দিকে তাকিয়ে আছে স্থির,নির্নিমেষ। আচমকা জড়িয়ে যাওয়া কন্ঠে বলে উঠল,
' আপনার গাল দুটো লাল রঙে ছেয়ে যাচ্ছে। আমার কাছে আয়না নেই। নয়ত আরশিতে দেখতে পেতেন আপনি,আপনার স্নিগ্ধ রক্তিম রূপ টুকু। '
চৈত্রিকা নিষ্প্রাণ,নির্বাক। কি বলল এটা সাফারাত?সত্যিই কি তার কপোলে ছেয়ে আছে লাল আভা?থাকলেই বা সাফারাত অকপটে পারল বলে দিতে!লজ্জা কাটানোর জন্য তড়িঘড়ি করে বললো,
' কেমন আছেন? এতোদিন পর হঠাৎ এত রাতে?আপনার চেহারা এমন দেখাচ্ছে কেন?আপনি কি অসুস্থ?'
চৈত্রিকার অনর্গল প্রশ্নে সাফারাত ভ্রুঁ উঁচিয়ে চাইল। তাতেই দমে গেল চৈত্রিকা। তার ভিতরকার সত্তা সাফারাতের এই কাজে দুর্বল হয়ে পড়ছে। বুকের ভিতর হাতুড়ি পেটা শব্দ হচ্ছে অনবরত। কথা বলার মতো উপযুক্ত শব্দ হারিয়ে বসল চৈত্রিকা। সাফারাত এগিয়ে এলো। খুব কাছাকাছি। চৈত্রিকার শ্বাস ভারি হয়ে আসতে শুরু করে ক্রমশ। সাফারাতের হুটহাট এতো কাছাকাছি তার শিরা উপশিরায় কাঁপন ধরিয়ে দেয়। শিহরণ জাগায় রন্ধ্রে রন্ধ্রে।
সাফারাত হাত বাড়ালো। মুহুর্তে চৈত্রিকার ভ্রুঁ যুগল ললাট ছুঁয়ে দিল। হকচকিয়ে গেল বেশ। নিজের হাত টা শূন্য অনুভব করতেই অপ্রতিভ হয়ে পড়ে। সাফারাত ফ্লাস্ক টা নিজের কাছে নিয়ে নিয়েছে অথচ টেরই পেল না। শ্রবণ গ্রন্থিতে পৌঁছে অনুরোধ সূচক ভরাট কন্ঠস্বর,
' আপনার হাত টা একটু ধরি চৈত্রিকা?'
এতো মায়া মিশানো আবেগি অনুরোধ অবজ্ঞা করতে ব্যর্থ হলো চৈত্রিকা। ছোট্ট করে প্রতুত্তর করে,
' হু!'
সাফারাত যেন এটারই অপেক্ষায় ছিল। নরম, কোমল হাত টা ধরতেই আঁতকে উঠে চৈত্রিকা। পা দুটো থামিয়ে বিচলিত,অস্থির কন্ঠে বলে উঠল,
' আপনার গায়ের তাপ অনেক বেশি সাফারাত। এতো জ্বর নিয়ে গভীর রাতে এখানে কি করছেন?'
সাফারাতের অভিব্যক্তি স্বাভাবিক। যেন চৈত্রিকা এমন প্রশ্ন করবে, অস্থির হয়ে উঠবে সে আগে থেকেই জানত। উত্তর দিল না। দুর্বোধ্য হাসল কেবল। চৈত্রিকা চমকে উঠে। উত্তরের আশায় চেয়ে আছে নিঃশব্দে। সাফারাত নিষ্প্রভ স্বরে তাড়া দিয়ে বললো,
' চলুন চৈত্র। রিকশাওয়ালা চাচা সেই কখন থেকে অপেক্ষা করছেন।'
চৈত্রিকা দাঁড়িয়ে রইল। সাফারাতের আলতো টানে এক পাও নাড়ালো না সে। জেদ চেপেছে মনে। সাফারাতের প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া তার মনে দাগ কেটেছে। মন হচ্ছে তাকে এড়িয়ে যাচ্ছে সাফারাত। অবহেলা করছে। বাধ্য হয়ে সাফারাত বলে উঠল,
4 days ago | [YT] | 8
View 1 reply
ঔপন্যাসিকা.কম
#সুখের_নেশায়
#লেখিকাঃআসরিফা_সুলতানা_জেবা
#পর্ব___৯
চৈত্রিকার কপাল বেয়ে ঘাম ঝড়ছে। গরম,তপ্ত নিঃশ্বাস বেরিয়ে আসছে নাসারন্ধ্র হতে। উত্তাপে হাসফাস অবস্থা। হাঁটছে আর লম্বা লম্বা শ্বাস ফেলছে। দুপুরের কড়া রোদের চেয়েও যেন তাপের প্রখর প্রদাহ অপরাহ্নে। আজকের বিকেল টা পুরোই অস্বস্তিতে ভরপুর। বাতাসের ছিটেফোঁটা নেই। পানির জন্য হাহাকার। গলা শুকিয়ে কাঠ পুরো। চৈত্রিকা আর এক পাও বাড়াতে পারছে না সামনের দিকে। পুরো দেহ জুড়ে গড়িয়ে যাচ্ছে ঘাম। শ্বাস প্রশ্বাস নিতে বড্ড কষ্ট হচ্ছে। তৃষ্ণায় ব্যাথা করছে গলা৷ লাস্ট টিউশন টা করিয়ে বেরিয়ে এল সে। পুরো আধাঘন্টার রাস্তা অতিক্রম করে ভীষণ ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত হয়ে পড়েছে দেহের প্রত্যেক টা অঙ্গ প্রতঙ্গ। না পেরে ধুলোবালিতে সজ্জিত ফুটপাতে বসে পড়ল। গরমের দাপটে মুখশ্রী অসম্ভব রকম লাল। চোখ জ্বলছে ভীষণ। চৈত্রিকা করুন দৃষ্টিতে সোজা পথের দিকে চেয়ে থাকল। তাকে আরো বিশ মিনিটের পথ পাড়ি দিতে হবে। কিন্তু শরীর!তা যেন আর এক মিনিটের পথ অতিক্রম করতে রাজি নয়।
কথায় আছে -সুস্থ দেহ,সুস্থ মন। দেহ ও মন একই সুতোয় বাঁধা। চৈত্রিকার সাথে তা যেন মিলে গেল অক্ষরে অক্ষরে। শরীরের দুর্বলতা তার মন কে দুর্বল করে দিচ্ছে ক্রমাগত। কোনোভাবেই সামলে উঠতে পারছে না নিজেকে। মনটা কাঁদছে অতি সন্তর্পণে। কিন্তু বহিঃপ্রকাশ করতে নারাজ মেয়েটা। সে উঠে পড়ে লেগেছে এই নিষ্ঠুর ধরায় নিজেকে শক্ত, আবেগহীনা প্রমাণ করতে। জাহির করতে। তবুও হেরে যাচ্ছে। নারী যতই চেষ্টা করুক শক্ত হবার,পাথরে পরিণত হওয়ার। একটা সময় দেখা যায় শক্ত খোলসের মধ্যে নরম মন,মায়া,দরদে ভরপুর। ঠিক যেমন ঝিনুক। নিজের খোলস টা শক্ত হলেও দেহ টা তো বড্ড নরম!
পঞ্চাশ টাকা বাঁচানোর জন্য ক্লান্ত দেহে হাঁটতে রাজি চৈত্রিকা। তার উপর তিনটে মানুষের দায়িত্ব। টিউশনি করে মানুষগুলোর জন্য কিছু করা কঠিন হয়ে দাড়াচ্ছে। প্রতিদিন রিকশা দিয়ে আসা যাওয়াতে অনেক টাকা খরচ হয়। কি হয় নিজের দেহ কে একটু কষ্ট দিয়ে যদি কিছু টাকা বাঁচানো যায়!বাঁচানো যায় বাবা,বোন,মা'কে। তাই তো চৈত্রিকা হেঁটে এসে টিউশনি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আজকাল রিকশাচালক রা ভাড়া অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। তারাও তো নিরুপায়। পেটে ভাত জুটাতে হলে এবং ঢাকা শহরে টিকে থাকতে হলে টাকার প্রয়োজন অত্যাধিক। চৈত্রিকার বুক চিঁড়ে দীর্ঘ একটা শ্বাস বেরিয়ে আসতে চাইল। কিন্ত এলো না বরঞ্চ তা দমিয়ে ক্ষীণ একটা শ্বাস ফেলল চৈত্রিকা। কানে এলো একটা ছোট্ট বাচ্চার অনুনয়ের স্বর। আওয়াজ লক্ষ্য করে সেদিকে চক্ষু নিবদ্ধ করে চৈত্রিকা। একটা বাচ্চা মেয়ে পেয়ারা ভর্তা বিক্রি করা লোক কে অনুরোধ করছে,
' কাকা একটু ভর্তা দেন। পাঁচ টেহা দিমু আমি।'
মেয়েটার আকুতি ভরা কন্ঠ লোকটার মন গলাতে পারছে না। উল্টো বিরক্তিতে চোখ মুখ কুঁচকে নিচ্ছে লোকটা। ধমকেছে অনেকবার। তবুও বাচ্চা মেয়েটা যেন নাছোড়বান্দা। চৈত্রিকার লাল, রক্তিম মুখ খানায় নিমিষেই একদলা কালো মেঘ এসে জড়ো হলো। লোকটার আচরণে তার মন ক্ষুব্ধ হলো। পাঁচ কিংবা ছয় বছরের ছোট্ট একটা মেয়ে। পড়নে একটা ছেঁড়া জামা। চেহারাটা মলিন,শীর্ণ। চৈত্রিকার মনটা হু হু করে উঠে। নিজের ব্যাগ হাতড়ে পাঁচ টাকার একটা পয়সা ব্যতীত কিছুই পেল না। মাসের শেষ দিন আজ। প্রায় দুইশো টাকা ছিল ব্যাগে,যা আহমেদের একটা ওষুধ কিনতেই শেষ। হতাশ হয়ে উঠে দাঁড়াল সে। কাঁদতে ইচ্ছে করল খুব। কিন্তু একদমই শোভা পায় না ক্রন্দনরত চেহারা। এই বলে নিজেকে নিজেই শাসায় চৈত্রিকা। ঢিমে ঢিমে পায়ে হেঁটে এসে বাচ্চা মেয়েটার পাশে দাঁড়াল। মেয়েটার কপোলে গড়িয়ে যাওয়া মুক্ত দানা গুলো মুছে দেয় যত্ন করে। নিজের হাতের পাঁচ টাকা মেয়েটার হাতে গুঁজে দিয়ে ম্লান হাসল। মৃদু স্বরে বললো,
' এবার পেয়ারার ভর্তা দিবে তোমাকে। তোমার হাতের পাঁচ টাকা আর আমার পাঁচ টাকা মিলে দশ টাকা হয়েছে। দশ টাকার ভর্তা দেয়া হয়। এখন আর তোমার দামি দামি অশ্রু গুলো বিসর্জন দিতে হবে না।'
মেয়েটা খিলখিল করে হেসে উঠল। ছোট মুখটায় উপচে পড়ছে আনন্দ। খুশিতে চৈত্রিকাকে জড়িয়ে ধরতে এসেও পিছিয়ে গেল এক পা। হয়ত নিজের অবস্থা বুঝে। চৈত্রিকা চিকন চিকন ঠোঁট দুটো প্রশস্ত করে,একটু ঝুঁকে কাছে টানল মেয়েটাকে। মেয়েটা আশ্বাস পেয়ে বুকে মিশে গেল তৎক্ষনাৎ। চৈত্রিকা আলতো কন্ঠে বললো,
' তোমার আমার জীবনে তেমন পার্থক্য নেই। দু'জনেই বোধ হয় তৃষ্ণার্ত ওই কাকের মতো,যে কিনা এক ফোঁটা পানির আশায় ছটফট করেছে। আমরাও করছি প্রতিনিয়ত সুখের নেশায়। জানি ধরা দিবে না। এই জীবনে সুখ আমাদের জন্য নয়। কিন্তু আশা রাখতে ক্ষতি কি বলো!'
মেয়েটার ছোট্ট মস্তিষ্কে চৈত্রিকার মুখে উচ্চারিত প্রত্যেক টা শব্দ তরঙ্গিত হলেও বুঝতে পারল না। ভর্তা পেয়ে খেতে শুরু করে। চৈত্রিকা সেদিকে তাকায় না আর এক পলকও। রাস্তা ধরে হাটতে শুরু করে। নিঃশব্দ,সূক্ষ্ম নিঃশ্বাস ফেলতে ফেলতে হেঁটে আসে অনেকখানি। এদিকে থেকে দু'টো রাস্তা। বাম দিকের টায় পা রাখতেই কারো চিৎকারে কেঁপে উঠে সমস্ত দেহ। কেউ বোধহয় ডাকছে তাকে। তড়িৎ গতিতে পিছন ফিরে তাকায়। ছোট্ট সেই মেয়েটাকে দেখে প্রচন্ড অবাক এবং বিস্ময়তায় ডুবে যায় নিমেষে। আপা,আপা ডাকতে ডাকতে কাছে এসে উপস্থিত হলো মেয়েটা। হাতে পানির বোতল ও দুই প্যাকেট ভর্তা। চৈত্রিকার দিকে বাড়িয়ে হাঁপানো কন্ঠে বলে উঠল,
' আপা লন। আপনের লাইগ্গা এগুলো।'
চৈত্রিকা কিংকর্তব্য বিমূঢ়। হতবাক, হতবিহ্বল দৃষ্টিতে তাকালো মেয়েটার হাতের দিকে। অপ্রস্তুত হলো অনেকটা। প্রশ্নবিদ্ধ নয়ন জোড়া। মুখে বললো,
' আমার জন্য মানে?তুমি এগুলো আমার জন্য কেন আনলে?টাকা কোথায় পেলে?'
' এক ভাইয়ে কিনে দিছে আপা। উনিও আপনের মতো বহুত ভালা। আমারেও আরও কিনে দিছে। আপনি লন,আমার গুলো লইয়া আমি বাড়িত যামু। আমার আম্মা পছন্দ করে ভর্তা। ভাইয়ে কইছে আপনের কাছে দিতে এইগুলো।'
চৈত্রিকা নিস্তব্ধ হয়ে পড়ল। সরব করে বললো,
' কে দিয়েছে আমাকে দেখাতে পারবে?'
মাথা দুলিয়ে সায় জানালো পিচ্চি মেয়েটা। তার পিছু পিছু যতখানি পথ পাড়ি দিয়ে এসেছিল ঠিক ততখানি এলো। কিন্তু পেল না মানুষটাকে। মেয়েটা মাথা চুলকে বললো,
' চইল্লা গেছে মনে হয় আপা। এডি নেন না। আমি বাসাত যামু।'
অস্থিরচিত্তে মেয়েটার হাত থেকে জিনিসগুলো নিয়ে নিল চৈত্রিকা। কে করছে এসব?কিছুই তার মাথায় ঢুকছে না। মাথা ব্যাথায় ছিঁড়ে যাচ্ছে মনে হচ্ছে। গরম হয়ে আছে অনেক। বোতলের মুখ খোলে কয়েক ঢোক পানি খেয়ে নিল। পিপাসায় কাতর গলা যেন এক পশলা বৃষ্টির ছোঁয়া পেল মুহুর্তে।
.
.
বাসায় ঢুকে টেবিলের উপর প্যাকেটগুলো রেখে দিয়ে অবাক হয়ে গেল। পুরো বাসায় নিরবতার অভাব নেই। কোনো প্রকার শব্দ চৈত্রিকার কর্ণে আসছে না। বাসায় কি কেউ নেই!তাহলে দরজা হালকা করে খোলা ছিল কেন!আস্তে ডেকে যখন কাউকে পেল না তখন জোরে জোরে হাঁক ছাড়তে শুরু করে। মিম পিছন হতে উদ্বিগ্ন স্বরে বলে উঠে,
' কি হয়েছে আপু?'
চকিতে ঘুরল চৈত্রিকা। নজর গেল মিমের হাতের কাপড়চোপড়ের দিকে। ছাঁদ থেকে শুকানো কাপড় গুলো নিয়ে এসেছে। মিমের প্রশ্নের প্রেক্ষিতে পাল্টা প্রশ্ন করে চৈত্রিকা,
' মা কোথায়?'
' উপরের বাসার ইহছান কাকাদের এখানে।'
চৈত্রিকার ভ্রুঁ কিঞ্চিৎ কুঁচকে এলো। দ্বিধান্বিত চাহনি নিক্ষেপ করল মিমের পানে।
' কেন?'
' কিছু টাকা ধার চাইতে। বাড়িওয়ালা বলেছেন আজ রাতের মধ্যে টাকা না দিলে কাল সকালে ধাক্কা মেরে বের করে দিবেন আমাদের। বাবা তো হাঁটতে পারে না। তাকে নিয়ে কোথায় যাবো আমরা আপু?কোথায় থাকব?'
মিম ডুকরে কেঁদে উঠল। মেয়েটার মনটা অনেক নরম। কোমলপ্রাণ মেয়েটা। হতে পারে বয়সের কারণে। হয়ত একটা সময় মিমও শিখে যাবে কঠোর হয়ে বাঁচতে। তার মতোই স্যাক্রিফাইস করতে। চৈত্রিকা চোখ বুঁজল।বোনকে জড়িয়ে ধরে কাদতে নিষেধ করে।ঠোঁট চেপে আটকে রাখল নিজের কান্না। চারদিকে এতো কান্নার আহাজারি কেন?কেন এতো কষ্ট পৃথিবীতে? আর সব কষ্টই বা কেন চৈত্রিকার ঘাড়ে চেপে বসল?প্রশ্ন থাকলেও, নেই উত্তর। বাবা কে হসপিটাল থেকে নিয়ে এসেছে আজ চারদিন অতিবাহিত হয়ে যাওয়ার পথে। সেদিন বাবার আদর পেতে গিয়েও পেল না চৈত্রিকা। কাছে গিয়ে বসতেই তার বাবা একহাত তার হাতের উপর রাখে। তৎপরে ফিরিয়ে নেয় মুখ। চৈত্রিকা বিস্তর কষ্ট পেলেও ক্ষীণ আনন্দ অনুভূত করেছিল। ডেকেছিল তো তার বাবা। তা-ই অনেক চৈত্রিকার জন্যে।
_____________
অন্ধকারাচ্ছন্ন রুম। চুপিচুপি ওষুধের পাতা টা বাবার রুমে রেখে এলো চৈত্রিকা। ফাহমিদা মিমের সাথে ঘুমিয়ে গেছেন। এই কয়েকদিনে তিনিও অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। চৈত্রিকা ধীরে ধীরে নিজের রুমে এলো। সঙ্গে সঙ্গে বেজে উঠে ছোট্ট বাটন ফোনটা। আকস্মিকতায় হকচকিয়ে যায় চৈত্রিকা। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে রাত বারোটা বেজে দশ মিনিট। এতো রাতে কে ফোন দিল!মোবাইল হাতে নিতে চোখে ভেসে উঠে অচেনা একটা নম্বর। হয়ত কেউ ভুলবশত তার নম্বরে ডায়াল করে ফেলেছে তা ভেবে ধরল না। কেটে গেল কল একটা সময়। বেজে উঠল পুনর্বার। চৈত্রিকা রিসিভ করে কানে ধরতেই কেউ অস্থির,ব্যগ্র কন্ঠে বলে উঠল,
' সময় লাগালেন কেন চৈত্র?এতো অপেক্ষা করাবেন না আমায়। সাথে সাথে কল ধরবেন।'
চৈত্রিকা চমকে গেল। ধরা গলায় বললো,
' সাফারাত আপনি?'
' হুম। আমি আপনার বাসার গেইটের কাছ থেকে কিছু দূরে দাঁড়িয়ে আছি চৈত্র। অপেক্ষা করছি আপনার। একটু আসুন না।'
সাফারাতের কন্ঠস্বর জড়িয়ে আসছে। মনে হচ্ছে কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে তার। চৈত্রিকা থমকে গেল। হসপিটালের সেই রাতের পর আজ এক সপ্তাহ পর কোথা থেকে উদয় হলো সাফারাত!এতোদিন একটাবারও তার দেখা পায় নি চৈত্রিকা। সাফারাত নিজেকে অমাবস্যার চাঁদ বানিয়ে নিয়েছিল যেন। যার দেখা মিলে না অহরহ, অহর্নিশ।
' বাসায় সবাই ঘুমোয় নি চৈত্র?আপনার কি আসতে প্রবলেম হবে?'
সাফারাতের কন্ঠ শুনে চৈত্রিকা নড়েচড়ে উঠল। আবারও জাগ্রত হচ্ছে অনুভূতি। বক্ষে আছড়ে পড়ছে উত্তাল ঢেউ। অন্তস্থল কাপছে দ্রুত বেগে। সাফারাত কখনও জানবে না,সে নিজের আগমনের সাথে চৈত্রিকার বুকে ঝড়ের আগমন ঘটিয়েছে। চৈত্রিকা নরম স্বরে বললো,
' প্রবলেম হবে না। আসছি আমি।'
' শুনুন! '
' হ্যাঁ! '
' আপনার হাতের চা খাবো। বাসায় চা পাতা থাকলে তিন কাপ বানিয়ে আনবেন প্লিজ।'
চৈত্রিকার কপালে ভাঁজ পড়ল। দৈবাৎ স্বরে বললো,
' তিন কাপ কেন?'
' এলেই বুঝবেন। অপেক্ষা করছি।'
চুপিসারে বিনা শব্দে,বেশ সাবধানে চা বানালো চৈত্রিকা। ফ্লাস্কে ঢেলে নিয়ে মাথায় ওড়না চাপাল। মা আর বাবা দু'জনেই ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়েছে তাই চিন্তা নেই। আস্তেধীরে বেরিয়ে দরজায় তালা দিয়ে নিচে এলো সে। এখানে এসে বাঁধল আরেক বিপত্তি। চৈত্রিকা ভুলেই গেছে দারোয়ান তো তাকে এতো রাতে বেরোতে দিবে না। কিন্তু সময় আজ যেন চৈত্রিকার বন্ধু। দারোয়ান চেয়ারে মাথা হেলিয়ে গভীর ঘুমে মগ্ন। পা টিপে টিপে হাতে ফ্লাস্ক নিয়ে চৈত্রিকা বেরিয়ে এলো। খানিকটা এগিয়ে আসতেই দেখল সাফারাত দাঁড়িয়ে আছে দূরে। ল্যাম্পপোস্টের আলোয় স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে চৈত্রিকা সাফারাতের উশখুশ চুল,মলিন, অনুজ্জল চেহারা। ধূসর রঙের চক্ষু জোড়া অসম্ভব লাল। ঠিক কৃষ্ণচূড়ার ন্যায়।
#চলবে,,!
(ভুল-ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।)
4 days ago | [YT] | 12
View 1 reply
ঔপন্যাসিকা.কম
#সুখের_নেশায়
#লেখিকাঃআসরিফা_সুলতানা_জেবা
#পর্ব___৮
' কি করছেন আপনি সাফারাত? ছাড়ুন আমাকে। লোক দেখবে।'
সাফারাতের কপালে রুষ্ট বলিরেখার ভাঁজ ফুটে উঠল। চক্ষুদ্বয় বুলালো আশপাশ। ওই তো দেখা যাচ্ছে, একটা বয়স্ক লোক চেয়ে আছে ওদের পানে ড্যাবড্যাব নেত্রে। সাফারাত এক ভ্রুঁ উঁচিয়ে চাইতেই লোকটা থতমত খেয়ে গেল। হাঁটতে শুরু করল নিজ গন্তব্যে। কোমর আঁকড়ে ধরে রাখা হাত টা চৈত্রিকার সারা শরীরের শিহরণ ভয়ে দিচ্ছে। চৈত্রিকা অবিন্যস্ত দৃষ্টিতে সাফারাতের দিকে তাকাল। তাকাতেই দেখল সাফারাত চেহারায় একরাশ গম্ভীরতা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হৃদয় জুড়ে সেই কিশোরী বয়স থেকে একটু একটু করে সঞ্চরিত করা অনুভূতিরা ছোটাছুটি করছে প্রচন্ড বেগে।
সাফারাতের এক ভ্রুঁ উঁচানো দৃশ্য টা তার চোখ এড়ালো না। মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় তাকিয়ে রইল চৈত্রিকা নির্নিমেষ। অন্তস্থলে তখন তুমুল বেগে বর্ষণ হচ্ছে। বর্ষণের সে-কি তীব্রতা,চৈত্রিকা চেয়েও দেখাতে অক্ষম। দৃষ্টি হলো স্থির, প্রগাঢ়। সাফারাতের কালো গেঞ্জি টা আঁকড়ে ধরে হাসফাস করতে লাগল। নিম্ন স্বরে বললো,
' নামিয়ে দিন না।'
চৈত্রিকার রক্তিম চেহারায় তীক্ষ্ণ চাউনি ফেলল সাফারাত। পরিহাস করে বললো,
' গেঞ্জি আঁকড়ে ঘনিষ্ঠ হচ্ছেন। আবার বলছেন নামিয়ে দিন না।'
মুহুর্তেই চৈত্রিকা যেন লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠল। অনুভব করতে পারছে তার গাল দুটো ভীষণ গরম হয়ে আসছে। হয়ত লাল টমেটোর আকারও ধারণ করে ফেলেছে ইতিমধ্যে। সাফারাতের বুক থেকে হাত টা ধীরে ধীরে ছাড়িয়ে আনতে নিলে কর্ণধারে প্রবেশ করল সাফারাতের ব্যগ্র, অস্থির কন্ঠস্বর,
' ছাড়বেন না চৈত্র। কারণ আমি আপনাকে আমার কোল থেকে নামাচ্ছি না। আপনার পুরো শরীর জ্বরে কাঁপছিল একটু আগেই। হাঁটার মতো শক্তি আছে বলে আমার মনে হয় না। থাকলেও এই অসুস্থ শরীর নিয়ে হাঁটতে দিব না আমি।'
ভরাট কন্ঠের এলোমেলো কথার তালে যেন হারিয়ে গেল চৈত্রিকা। আহা!কি সুখ মিশে আছে প্রত্যেক টা শব্দে, বাক্যে!চৈত্রিকার মন খুব করে চাইছে সময়,মুহূর্ত থমকে যাক সব। সাফারাতের মুখ থেকে অনুভূতি জড়ানো বাক্যগুলো শুনতে আঁকড়ে ধরে রাখুক সাফারাত কে হৃদয়পটে,মনের গহীনে। কিন্তু, আদৌ কি তা সম্ভব! সাফারাত কেবল,কেবলই বন্ধুত্বের খাতিরে আগের মতো করেই তার কথা ভাবছে। এটাই চৈত্রিকার ধারণা। ভয় করে তার ভালোবাসা প্রকাশ করতে। যদি আবারও সাফারাত ক্রুদ্ধ হয়ে ফিরিয়ে নেয় মুখ? তাহলে তো একটু আকটু পাওয়া সুখগুলোও হারিয়ে বসবে সে। তাই থাকুক বন্ধুত্ব। সাফারাতের অস্ত্বিত্ব হলেই কেটে যাবে জীবন।
করিডোরে মানুষের চলাচলের আওয়াজ কাঁপিয়ে তুলল চৈত্রিকা কে। সাথে সাথে উপলব্ধি করল কোমরে বলিষ্ঠ হাতের বাঁধন গভীর হয়েছে। চৈত্রিকা হকচকালো, ভড়কাল খানিকটা। মৃদুস্বরে কিছু বলতে যাবে তার আগেই সাফারাত কপাল কুঁচকে বলে উঠল,
' আপনার লোক লজ্জার ভয় হলে,নিঃসংকোচে আমার বুকে মুখ লুকাতে পারেন চৈত্র। '
নির্লিপ্ত, নির্বিকার কথা শুনে চৈত্রিকার মাথাটা ঘুরতে শুরু করে। সাফারাতের অকপটে বলা কথাটুকু চৈত্রিকার বক্ষস্পন্দন বাড়িয়ে তুলল। মিন মিনে স্বরে বললো,
' ঠিক আছি আমি।'
ডাক্তারের কেবিনের সামনে এসে সাফারাতের পা দুটো থেমে গেল। একজন নার্স কে দেখে বললো,
' ড. সিফাত নেই?'
' না স্যার। উনি একটু আগেই বেরিয়ে গেছেন।'
' ওহ্। আপনি জ্বর মাপতে পারবেন?আর ড্রেসিংও করে দিতে হবে।'
' পারব স্যার।'
কেবিনে প্রবেশ করে চৈত্রিকা কে সাবধানে বেডে বসিয়ে দিল সাফারাত। নার্স কে ইশারা করল চৈত্রিকা কে দেখতে। মেয়েটার শরীর খুব দুর্বল হয়ে পড়েছে। বৃষ্টিতে ভিজার কারণে গাঁ কাপিয়ে জ্বর এসেছে। সাফারাত যখন একদম সন্নিকটে দাঁড়িয়ে ছিল তখন চোখে বিঁধল মেয়েটার দেহের কাঁপুনি। হুট করেই কাঁপতে শুরু করে। হাতটা আলতো করে স্পর্শ করতেই দেখে প্রচন্ড গরম দেহ। লিফট খুলতেই দেরি না করে কোলে তুলে নেয় চৈত্রিকা কে।
নার্স সাফারাতের দিকে এক পলক তাকিয়ে চৈত্রিকার মুখে থার্মোমিটার পুরে দিল। নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল,
' ম্যাম একটা প্রশ্ন করি?'
মাথা হেলালো চৈত্রিকা। মেয়েটা খুশিতে গদগদ হয়ে প্রশ্ন ছুড়ল,
' ইনি কি আপনার হাসবেন্ড?'
দু'পাশে মাথা নাড়াল চৈত্রিকা। মেয়েটার মুখে চিন্তার রেখা প্রতীয়মান হলো। ফের দ্বিধান্বিত কন্ঠে বললো,
' বয়ফ্রেন্ড?'
পূর্বের মতোন না করল চৈত্রিকা। এক পাশে স্থির দাঁড়ানো সাফারাতের পানে দুর্বল দৃষ্টি মেলে ধরল। তার দিকেই নিষ্পলক তাকিয়ে আছে সাফারাত। চেহারায় অসীম অস্থিরতার ছাপ। চৈত্রিকা মুখ থেকে থার্মোমিটার টা বের করে নার্সের হাতে ধরিয়ে দিল। থার্মোমিটারের পারদ তরতর করে ছুটছে ঊর্ধ্বগতিতে। জ্বর ১০২°। দুর্বল কন্ঠে ও আনমনে আওড়ালো,
' বেস্ট ফ্রেন্ড। '
' আপনার বেস্ট ফ্রেন্ড খুব হ্যান্ডসাম ম্যাম। ইনি কি সিংগেল?'
চৈত্রিকা জবাব দিতে পারল না সঙ্গে সঙ্গে। নিমগ্ন হলো চিন্তায়। সাফারাত সিংগেল নাকি কেউ আছে তার জীবনে?খুব করে জানতে ইচ্ছে করছে তার। কিন্তু ব্যাপারটা খারাপ দেখায়,তাই দমে গেল। দমিয়ে নিল অনুভূতি,ইচ্ছে, স্পৃহা।
নার্স চৈত্রিকার কাঁধের নিচে ড্রেসিং করে দিল। সাফারাতের দিকে চেয়ে বললো,
' ম্যাম একটু ফ্রেশ হলে শরীর টা ভালো লাগবে স্যার। আমি নরমাল ওষুধের নাম লিখে দিচ্ছি,এতে জ্বর সেড়ে যাবে।'
' থ্যাংকস নার্স।'
সাফারাত চৈত্রিকার দিকে চেয়ে সাবলীলভাবে বললো,
' চলুন চৈত্র। '
চৈত্রিকা বেড ছেড়ে দাঁড়ালো নড়বড়ে পায়ে। শরীর কাঁপছে মৃদু,মৃদু। সাফারাত সূক্ষ্ম নিঃশব্দ নিঃশ্বাস ফেলে এগিয়ে এলো কাছাকাছি। চৈত্রিকা নার্সের দিকে আঁড়চোখে তাকালো। লজ্জিত ভঙ্গিতে বললো,
' হাত টা ধরলেই হবে। আমি হাঁটতে পারব।'
সাফারাত হাত মুষ্টিমেয় করে নিল শক্ত করে। নিরবে হেঁটে এসে দু'জনে উপস্থিত হলো আহমেদ সাহেবের কেবিনের সামনের দিকটায়। মিম হন্তদন্ত হয়ে কাছে আসল। বোন কে ফিরে আসতে না দেখে কলিজা টা ভয়ে ছোট্ট হয়ে ছিল এতক্ষণ। তবে চৈত্রিকার গা ঘেঁষে থাকা ছেলেটা কে দেখে চোখ বড়সড় হয়ে এলো মিমের। হতবিহ্বল দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
কেবিনের সামনের বেঞ্চে চৈত্রিকা কে বসিয়ে দিল সাফারাত। মিম ভীত সন্ত্রস্ত পায়ে বোনের পাশে বসল। কানের কাছে মুখ নিয়ে ছোট্ট করে বললো,
' আপু, সাফারাত ভাই না উনি?'
সঙ্গে সঙ্গে চৈত্রিকা প্রতিউত্তর করল,
' হুম।'
মিমের মনে অনেক প্রশ্ন জাগলেও, এই মুহুর্তে তা করল না সে। চোরা দৃষ্টিতে কয়েক পল দেখল সাফারাত কে। একবার সাফারাত কে দেখছে তো,আরেকবার নিজের বোন কে। কেন যেন অঢেল শান্তি অনুভব করছে সে। কারণ টা অজানা। হয়ত বা বোনের সুখের কথা ভেবে।
দিহান হাতে একটা প্যাকেট নিয়ে দ্রুত পদে আসল সাফারাতের সামনে। চৈত্রিকা ও মিমের দিকে এক নজর চেয়ে পরক্ষণেই সাফারাতের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করল। সাফারাত দাড়িয়ে আছে ওদের থেকে কিছুটা দূরত্ব রেখে। রাতের নিস্তব্ধতায় হসপিটাল টা ভূতের বাড়িতে পরিণত হয়েছে। কারো পায়ের শব্দও ঝংকার তুলে কর্ণকুহরে। দিহান হাসি হাসি মুখ করে বললো,
' ছেলেগুলো কে পেয়ে গেছি ভাই। মোট চারজনই তো ছিল।'
সাফারাত কপাল কুঁচকালো। ভরাট কন্ঠে বললো,
' খাতির যত্নে যেন ত্রুটি না হয় দিহান।'
' একদমই হবে না। খাবার কার জন্য আনতে বললি?'
' চৈত্রর কাছে দিয়ে আয়।'
দিহান খাবারের প্যাকেট টা এগিয়ে দিল চৈত্রিকার কাছে। চৈত্রিকা চমকে গেল। নিল না হাতে। দিহান মিমের হাতে ধরিয়ে দিতে মনে মনে ফুঁসে উঠল মিম। এই ছেলেকে একদম সহ্য করতে পারছে না সে। মুখ দেখেই বার বার বোনকে করা অপমানের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। সেদিন যদি পারত তাহলে আচ্ছামতো ধুয়ে দিত সে দিহানের মা'কে। দিহান মিমের নিকষকৃষ্ণ আঁখিযুগলে রাগের
আভাস দেখতে পেয়ে বিস্মিত হলো। পিচ্চি মেয়েটা কি তাকে রাগে,ক্ষোভের অনলে পুড়িয়ে ভস্ম করতে চাচ্ছে! মনে তো হচ্ছে এমনি।
সাফারাত দূরে দাঁড়িয়ে আদেশের সুরে বললো,
' খেয়ে নিন চৈত্র। ওষুধ খেতে হবে আপনার। অন্যের জন্য চিন্তা করতে হলেও নিজের সুস্থ থাকা জরুরি। '
অনিচ্ছা সত্ত্বেও চৈত্রিকা একটু খেল। যাকে বলে নাম মাত্র খাওয়া। মুখ টা তেঁতো হয়ে আছে। বমি পাচ্ছে তার। কিন্তু সাফারাত ঠিকি বলেছে বাবার জন্য হলেও তার সুস্থ থাকা দরকার। সামনে অনেক দায়িত্ব তার। অনেক। বাবা তো কোনোদিনও নিজের পায়ে দাঁড়াবেন না আর। তাকে বাবার চিকিৎসার খরচ চালাতে হবে। মা,বোনকে আগলে রাখতে হবে। মেহুল থাকলে হয়ত তা-ই করত। মেয়ে বলে সে ঘরের এক কোণে শীর্ণ হয়ে পড়ে থেকে থেকে নিজের পরিবার কে না খেয়ে ধুঁকে ধুঁকে মরে যেতে দিবে তা অসম্ভব।
দিহান সাফারাতের পাশে দাঁড়িয়ে বলে,
' আমাদের আর এখানে থাকা ঠিক হবে না। ভিতরে চৈত্রিকার মা আছেন। আমাদের হঠাৎ এখানে দেখলে খারাপ ভাবতে পারেন। চলে যাওয়ায় বেটার। ওরা এখানে সেফ। রাত একটা বাজছে। চল ফিরে যাই।'
সাফারাত তোয়াক্কা করল না দিহানের কথা এমন ভঙ্গি করল। বড় বড় পা ফেলে এসে দাঁড়াল চৈত্রিকার সামনে। পায়ের শব্দে নত মাথা উপরে তুলল চৈত্রিকা। সাফারাতের বুকটা ধুক করে উঠল যেন। বক্ষে বইতে লাগল শীতল,হিম অনিল। চৈত্রিকার পাশে বসা মিমের দিকে চোখ রাখল। মিম কি বুঝল কে জানে,নিমিষেই উঠে দাঁড়াল। মৌন হয়ে হেঁটে গিয়ে করিডোরের জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। নজর রাখল বাহিরে। সাফারাত হাত বাড়িয়ে চৈত্রিকার কপালের চুল গুলো কানের পিঠে গুঁজে দিল। সাথে সাথেই চোখ বুঁজে ফেলল চৈত্রিকা। নেত্রপল্লব কাঁপছে ক্ষীণ। সেদিকে দৃষ্টি মেলে সাফারাত নিষ্প্রভ স্বরে বলে উঠল,
' আমি নিচে থাকব। আপনার যখনই আমার প্রয়োজন হবে করিডোরের জানালা দিয়ে শুধু একটা বার হাত বাড়িয়ে ডাকবেন চৈত্র। নিচে যাচ্ছি। খেয়াল রাখবেন নিজের। '
শূন্য অনুভূতিতে ছেয়ে গেছে চৈত্রিকার অভ্যন্তর। চক্ষু তৃষ্ণায় খাঁ খাঁ করছে মন। সাফারাত নেই পাশে। চলে গেছে কিছু সময় আগে। চৈত্রিকা তড়িৎ গতিতে জানালার কাছে এসে দাঁড়াল। বিস্ময়কর দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল নিমেষ। সাফারাত দাঁড়িয়ে আছে গাড়িতে হেলান দিয়ে। চক্ষুদ্বয়ের দৃষ্টি উপরের দিক। ঠিক চৈত্রিকার বরাবর। চৈত্রিকা প্রাণ ভরে শ্বাস টেনে নিল নিজের মাঝে। একটুখানি হাসলে কি ক্ষতি হবে?মনটা ফুড় ফুড়ে হয়ে গেছে। হাসবে না সে। আপনাআপনি হাসলে তো সাফারাত বলবে পাগল। দূর হতে দূর মানুষ দু'টো । অথচ একে অপরের দৃষ্টিতে ভাসছে দু'জন অহর্নিশ।
.
.
ধীর গতিতে চন্দ্রমার শেষ লালিমা টুকু মিশে যাচ্ছে ধরাতলে। নিকষকালো অন্ধকার উপেক্ষা করে একফালি রশ্মি ধরণীর বুকে ছুঁয়ে দিতে শুরু করে। হসপিটালে মানুষের চলাচলের পদধ্বনি প্রখর হচ্ছে। বেড়ে চলেছে আস্তে আস্তে। চৈত্রিকা নড়েচড়ে উঠল। ব্যাথায় সমস্ত দেহ বিষিয়ে আছে। পিটপিট করে চোখ মেলতেই চোখে পড়ল নার্সদের ছুটোছুটি। অকস্মাৎ কিছু একটা মস্তিষ্কে উদয় হতেই চৈত্রিকা ছুটে এলো জানালার কাছে। সাফারাত নেই। চলে গেছে বোধ হয়। সারারাত ঘুমোয় নি চৈত্রিকা। ক্ষীণ সময় পর পর শুধু সাফারাত কে অবলোকন করেছে। বন্দী করেছে অক্ষিপটে। ভোর অব্দি সাফারাত ছিল নিচে। মুখখানায় ক্লান্তি,অবসাদ ছিল। চৈত্রিকার একবার বলতে ইচ্ছে করেছিল, আপনি চলে যান সাফারাত। পরমুহূর্তে আবার সিদ্ধান্ত বদলে নেয়। থাকুক না সাফারাত। অসুস্থ শরীর নিয়ে আর জাগ্রত থাকতে পারে না সে। একটু আগে বেঞ্চে বসতেই চোখ লেগে আসে অজান্তেই।
চৈত্রিকার বুক চিরে একটা দীর্ঘ শ্বাস বেরিয়ে এলো। মিশে গেল প্রকৃতিতে। এই মুহুর্তে উপলব্ধি করল ভালোবাসা খুব করে পোড়াচ্ছে তার ভিতর। মনে হচ্ছে সে একটু পেয়ে আরেকটু পাওয়ার আশায় লোভী হয়ে উঠছে। ছোট বেলায় তো পড়েছে অতি লোভে তাতি নষ্ট। না সে পারবে না ভালোবাসা পাওয়ার আশায় সাফারাত কে দ্বিতীয় বার হারিয়ে ফেলতে।
___________
বাবার কেবিনে উঁকিঝুঁকি মেরে প্রবেশ করল চৈত্রিকা। ঘুমোচ্ছেন আহমেদ। ফাহমিদা ইশারা করলেন কাছে এসে বসতে। চৈত্রিকা মাথা নাড়িয়ে না করল। মন ভরে চোখের তৃষ্ণা মেটালো বাবার মুখ খানাতে চেয়ে। কেবিন থেকে বেরিয়ে যেতে মন চাইছে না। মনটা শক্ত করে বেরোতে যাবে তখুনি ফাহমিদা বলে উঠলেন,
' দাঁড়া চৈত্র,তোর বাবা ডাকছেন তোকে।'
থমকে গেল পা দু'টো। ভয়ের তাড়নায় হৃদস্পন্দন হতে লাগল অস্বাভাবিক। বাবা আবার হাইপার হয়ে যাবে না তো!কি করল সে?কেন এলো কেবিনে!দুরুদুরু বুক নিয়ে আহমেদ সাহেবের দিকে তাকাতে দেখল,তিনি হাত বাড়িয়ে ডাকছে তাকে। ইশারা করছেন কাছে যাবার। চৈত্রিকা নড়ছে না। সত্যিই কি ডাকছে তার বাবা তাকে!
#চলবে,,!
(ভুল-ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।)
পিক ক্রেডিট ঃ সুমাইয়া আক্তার🖤
4 days ago | [YT] | 22
View 1 reply
Load more